আইনি ভাষায় কোনো চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দের ব্যবহার সেই শর্ত পালনকে বাধ্যতামূলক করে। ৩২ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ চুক্তিতে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৩১ বার। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা বা ‘ইউএস শ্যাল’ লেখা হয়েছে মাত্র ৬ বার। চুক্তির এই বিশাল ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশকে কার্যত একতরফাভাবে মার্কিন শর্ত মানতে বাধ্য করছে।
একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এমন একটি বড় সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে জাতীয় সংসদে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে এই ‘গোলামি’ চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে।
চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের ওপর চেপে বসা প্রধান শর্তসমূহ
১. মার্কিন পণ্যে অবাধ প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণহীন বাজার: চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড়া অন্য কোনো নিয়ম, কাগজপত্র বা মান যাচাইয়ের শর্ত আরোপ করতে পারবে না বাংলাদেশ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তা সনদ থাকলেই সেই পণ্য গ্রহণ করতে হবে, বাংলাদেশ অতিরিক্ত কোনো শর্ত দিতে পারবে না। এর ফলে দেশের স্থানীয় শিল্প ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২. কৃষি ও পোলট্রি খাতে বড় ছাড়: বাংলাদেশকে মার্কিন দুগ্ধ, মাংস ও কৃষিপণ্যের মানকে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করতে হবে। বার্ড ফ্লু বা অন্য কোনো সংক্রমণ দেখা দিলেও পুরো রাজ্য থেকে আমদানি বন্ধ করা যাবে না। কৃষি জৈব প্রযুক্তি বা জিএমও পণ্যের ক্ষেত্রেও ২৪ মাসের মধ্যে নিয়ম শিথিল করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
৩. ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও ডেটা নিরাপত্তা: চুক্তিতে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সোর্স কোড বা গোপন তথ্য চাইতে পারবে না বাংলাদেশ। এমনকি ডিজিটাল সেবার ওপর এমন কোনো কর বসানো যাবে না যা মার্কিন কোম্পানির স্বার্থের পরিপন্থী হয়। এতে দেশের সাইবার নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৪. বিমা ও বিনিয়োগ খাতে নিয়ন্ত্রণ হারানো: মার্কিন বিমা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে আর দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে ‘রিইন্সিওরেন্স’ করতে হবে না। এছাড়া তেল-গ্যাস, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মালিকানার সীমা শিথিল করতে হবে।
৫. শ্রম আইন ও ইপিজেডে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন চাপ মেনে ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন চালুসহ শ্রম আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনতে হবে। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করার মতো বিচারিক বিষয়েও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ঝুঁকি
চুক্তির একটি অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের স্বাধীন জ্বালানি নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আজ্ঞাবহ বাজারে পরিণত হওয়ার পথে। চুক্তিতে একতরফা শর্তারোপ করা হলেও বিনিময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা অন্য পণ্যের জন্য বড় কোনো সুনির্দিষ্ট সুবিধার নিশ্চয়তা মেলেনি। বরং বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক বসানোর সুযোগ রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
অন্তর্বর্তী সরকার জনমতের তোয়াক্কা না করে কেন এমন একতরফা চুক্তিতে সই করলো, তা নিয়ে এখন চারদিকে জবাবদিহিতার দাবি উঠছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা বহুলাংশে ওয়াশিংটনের হাতে চলে যাবে।