বেইজিংয়ের নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র আমন্ত্রণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দুই দিনের সরকারি সফরে চীন যাচ্ছেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ শক্তিশালী করা। ওয়াং ই’র সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন বেইজিং সফরের সময়সূচি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।
সূত্রগুলো আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে জুনের শেষ বা জুলাইয়ের শুরুতে তিনি চীন সফরে যেতে পারেন।
জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সম্ভাবনা প্রবল। এই সফরের এজেন্ডা এবং সময়সূচি চূড়ান্ত করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চলতি সপ্তাহেই বেইজিং যাচ্ছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র আমন্ত্রণে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে
অবশ্য, ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর সফর পরিকল্পনা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে নারাজ। সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক শুধুমাত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেইজিং সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং যাচ্ছেন, এটুকুই এখন বলা সম্ভব। এর বাইরে সফরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমার জানা নেই।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশ দিয়ে শুরু করবেন, তা নিয়ে কূটনৈতিক পাড়ায় নানা জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এই অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে, সরকারপ্রধান প্রথমে সার্কভুক্ত কোনো দেশ সফর করতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গুঞ্জন রয়েছে, এক্ষেত্রে ভুটান হতে পারে তার প্রথম গন্তব্য। সার্কভুক্ত দেশ সফরের পরপরই তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী চীনের বেইজিং সফরে যেতে পারেন।
এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভের পর গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, চীন, জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশই তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশ দিয়ে শুরু হবে, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা চলছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি প্রথমে সার্কভুক্ত কোনো দেশ, সম্ভবত ভুটান সফর করতে পারেন। এরপর তিনি চীন সফরে যেতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে
তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে সৌদি আরবের নামও আলোচনায় এসেছে। অনেকে মনে করছেন, সৌদি সফরে গেলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি তিনি ওমরাহ পালনের সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেন।
এদিকে, এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং তাৎক্ষণিকভাবে জানায়, সফরের দিন-তারিখ ও সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি এবং তিনি প্রথমে কোন দেশ সফর করবেন— সেটিও নির্ধারিত হয়নি।
সরকারের এক কূটনীতিকের মতে, ‘কৌশলগত কারণে প্রধানমন্ত্রী শুরুতে ভারত বা চীনে যাবেন না বলে আমার ধারণা। সার্কভুক্ত কোনো দেশ দিয়ে শুরু করাটাই তার জন্য শ্রেয় হবে।’
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং ও দিল্লি সফরের অভিজ্ঞতার আলোকে তারেক রহমানের এই সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত ও চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার মুখে বিএনপি সরকারের এই প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফয়েজ মনে করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রথমে চীনে গেলে অনেকেই অনেক রকম কথা বলতে পারেন। কিন্তু চীন আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার। তাই চীনকে গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে ভারত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেছেন, এখন চীন যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী আগে চীনে গেলেও আমি অবাক হব না। আর এর ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে না।’
প্রসঙ্গত, এপ্রিলের শুরুতে শুভেচ্ছা সফরে ভারত গিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এক মাসের ব্যবধানে তার বেইজিং সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার মেয়াদকালে চীন সফর করেছিলেন। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, বেইজিংয়ের আগে তিনি আসলে দিল্লি সফর করতে চেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (বর্তমানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করে ঢাকা’র এই আগ্রহের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতিতে ভারত সেই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি, যা ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা।
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে চীনে গেলে অনেকেই অনেক রকম কথা বলতে পারেন। কিন্তু চীন আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার। তাই চীনকে গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে ভারত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেছেন, এখন চীন যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী আগে চীনে গেলেও আমি অবাক হব না। আর এর ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে না
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফয়েজ
অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর নিয়েও কূটনৈতিক পাড়ায় নানামুখী আলোচনা এখনও সতেজ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর দিল্লি নাকি বেইজিং হবে— তা নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে এক অদৃশ্য কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল।
এই দিল্লি-বেইজিং স্নায়ুযুদ্ধের মাঝেই ২০২৪ সালের এপ্রিলে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেছে নেন থাইল্যান্ডকে। পরবর্তীতে জুনে তিনি দিল্লি সফর করেন। দিল্লি সফরের মাসখানেকের মধ্যেই জুলাই মাসে (২০২৪) তিনি বেইজিং সফরে যান। কিন্তু এই সফরটি কূটনৈতিক অঙ্গনে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দেয়, কারণ নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই সফর সংক্ষিপ্ত করে তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শেখ হাসিনা যখন বেইজিংয়ে ছিলেন, তখন বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করছিল। চীন সফর থেকে ফেরার মাস না পেরোতেই ছাত্র-জনতার প্রবল অভ্যুত্থানের মুখে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ৫ আগস্ট পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন, যেখানে তিনি এখনও অবস্থান করছেন। বিগত সরকারগুলোর এই অভিজ্ঞতা এবং ভারত-চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার আলোকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।