চোখের চিকিৎসা নিতে স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছাতেও তখন বাকি ছিল মাত্র কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার বদলে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারালেন দীর্ঘ ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করা এই নারী।
রোববার (৩০ আগস্ট) বাদ জোহর বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় রনজিলা পারভিনের প্রথম জানাজা। সেখানে শেষবারের মতো প্রিয় শিক্ষিকাকে বিদায় জানাতে জড়ো হন সহকর্মী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সকালে মরদেহ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো পরিবেশ। যে মাঠে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের কোলাহল শোনা যেত, সেখানে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষবার দেখতে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ। স্বজন ও সহকর্মীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বিদ্যালয়ের বাতাস।
‘আর ৩০-৪০ সেকেন্ড পরই হাসপাতালে পৌঁছাতাম’ জানাজায় স্ত্রীকে হারানোর লোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রনজিলার স্বামী আব্দুল মতিন।
তিনি বলেন, ‘আমরা রিকশায় চেপে যাচ্ছিলাম। আর হয়তো ৩০ কিংবা ৪০ সেকেন্ড সময় লাগত, আমরা হাসপাতালে পৌঁছে যেতাম। তার আগেই দুজন মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারী আমার স্ত্রীর হাতব্যাগ হ্যাঁচকা দিয়ে নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ টান দেওয়ায় সে নিজের ভারসাম্য রাখতে পারেনি। রিকশা থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায়। রিকশা চলন্ত থাকায় পড়ে যাওয়ার জায়গা থেকে প্রায় ১০ হাত দূরে ছিটকে যায় সে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে স্বামীর।
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক ৩০-৩২ বছর শিক্ষকতা করার পর এভাবে অকালে চলে যাবে—এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। সে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিল, অথচ তাকে লাশ হয়ে ফিরে আসতে হলো। আমি এই ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।’ রনজিলার স্বামী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাড়ির পাশের বিদ্যালয়ে তার স্ত্রী দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন।
চিকিৎসার জন্য যাত্রা, ফিরলেন লাশ হয়ে পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোরে স্বামী মতিউত রহমানের সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিলা পারভিন।
রাজধানীতে পৌঁছে রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার সময় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনাটি। দুই মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারী তার হাতব্যাগে হ্যাঁচকা টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর মাথায় আঘাত পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসার আশায় ঢাকায় যাওয়া মানুষটির আর হাসপাতালের দরজা পর্যন্ত পৌঁছানো হলো না।
ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার মধ্যরাতে রনজিলার মরদেহ বগুড়া শহরের রহমাননগরের বাড়িতে পৌঁছায়। রাত পেরিয়ে রোববার সকালে সেই মরদেহ নেওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের প্রিয় কর্মস্থল বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
যে বিদ্যালয়ে জীবনের বড় একটি সময় শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলেছেন, সেই বিদ্যালয়েই এবার তাকে ঘিরে শেষবারের মতো দাঁড়াল তার প্রিয় মানুষগুলো।
শিক্ষার্থীদের চোখে শেষ বিদায় জানাজায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সহকর্মীদের চোখেমুখে ছিল শোকের ছাপ। যিনি এতদিন তাদের শিখিয়েছেন জীবনের পাঠ, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার কথা সেই শিক্ষককেই এভাবে হারানোর বেদনা যেন কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না।
একজন শিক্ষকের কর্মস্থলে শেষ বিদায়ের এমন দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, একটি বিদ্যালয় ও একটি এলাকার মানুষের শোকের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
প্রথম জানাজা শেষে রনজিলা পারভিনের মরদেহ নেওয়া হয় তার নিজ গ্রাম গাবতলী উপজেলার তরফসরতাজে। সেখানে বাদ আসর দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
চিকিৎসা নিতে গিয়ে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে প্রাণ হারানো এই শিক্ষিকার পরিবারের এখন একটাই দাবি ঘাতকদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।