একসময় গ্রাম বাংলায় বাঁশ-বেতের তৈরি ছোট-বড় ঝুড়ি, খাঁচা, কুলা, মুরগির ঘর, ঢাকনা, চাটাই, হাতপাখা, বসার মোড়া, পাটি, মাছ ধরার পলো, বিত্তি, দুয়াড়ি, ঘুনি, কৃষকের মাতাল, ধান রাখার ধামা, পালি ইত্যাদির বেশ প্রচলন ছিলো।কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বাজারে কম দামে রকমারি প্লাস্টিকের পণ্যের দাপটে বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিস পত্রের কদর কমে গেছে। যার কারনে অনেকেই এখন এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে এক সময় বাঁশ-বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারের বেশ প্রচলন ছিলো। অধিকাংশ বাড়িতে নারী পুরুষ মিলে বাঁশ-বেত দিয়ে এসব জিনিসপত্র তৈরি করতো। কিন্তু এখন আর এসব দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে বংশপরম্পরায় কিছু মানুষ এখনো এই পেশাকে টিকিয়ে রেখেছে।
জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের দাস পাড়ায় গিয়ে কয়েকটি পরিবারের বাঁশ-বেত দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করতে দেখা যায়।
শ্রী নারান দাস বলেন, এক সময় এই দাস পাড়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে বাঁশ-বেত দিয়ে জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা ও বাঁশ-বেতের দাম বৃদ্ধির কারনে এই পেশা ছেড়ে অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছে। শ্রী বুদো দাস বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা এই পেশায় জড়িত ছিলো। তাদের কাছ থেকে কাজ শিখে ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। কিন্তু এখন আর চলছে না।
আগের মত বাঁশ-বেত পাওয়া যায় না। একটা বাঁশের দাম এখন ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। কিন্তু সেই তুলনায় বাঁশের তৈরি জিনিসের দাম বাড়েনি। আমাদের ছেলে, মেয়ে নাতিপুতিরা এখন আর এই কাজ শিখতে আগ্রহ দেখাই না। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে এই পেশাকে ধরে রাখতে পারতাম।
শ্রীমতী বাসন্তী রাণী বলেন, আমরা বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে খাই। অনেক বছর ধরে এই কাজ করছি। এতে করে কোন রকমে সংসার চলে। কিন্তু আমরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারিনি।আজও সরকারের কোন সহযোগীতা পাইনি।
জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় আনুমানিক ৪৭৬ জন কারিগর এখনো এই পেশাকে টিকিয়ে রেখেছেন। তবে প্লাস্টিকের পণ্যের দাপট ও প্রয়োজনীয় বাঁশ-বেত না পাওয়ার কারণে বাংলার ঐতিহ্য এই শিল্প দিনদিন হারিয়ে যেতে বসেছে।
জীবননগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জাকির উদ্দিন মোড়ল জানান, বাঁশ-বেত শিল্পের পেশার সাথে জীবননগরের বেশ কিছু মানুষ এখনো জড়িত আছে। বংশপরম্পরায় তারা ঐতিহ্যগতভাবে এই পেশাকে ধরে রেখেছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই শিল্পের সাথে যারা জড়িত আছে তাদেরকে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করে থাকি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।জীবননগর উপজেলায়ও প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা প্রদান করে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।