বাবুর মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর থেকে স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। সকালে আমিনবাজারের হাজিবাড়ী মসজিদের সামনে লাশবাহী গাড়ির পাশে স্বামীকে শেষবারের মতো দেখতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী গুলশানারা। সঙ্গে ছিল তাঁদের আট বছরের মেয়ে এলিনা হাসান রোজা।
স্বামীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন গুলশানারা। তিনি বলেন, ‘ব্যবসার কাজে সে (বাবু) কলকাতায় যেত। সে এভাবে পৃথিবী থেকে চলে গেল, আমাকে রেখে। আমাকে বিধবা বানাল, আমার দুইটা বাচ্চাকেও এতিম বানাল।’
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চিন্তিত গুলশানারা। সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দুই বাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য সরকার যেন কিছু একটা করে। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী যেন একটা চাকরির সুযোগ করে দেয়।’
বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কাঁদছিল শিশু রোজাও। বাবার সঙ্গে ভারতের যাতায়াতের স্মৃতি মনে করে সে বলে, ‘বাবা ইন্ডিয়া থেকে আসার সময় চকলেট আনত, চিপস আনত। অনেক কিছু কিনে দিত।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, গতকাল শনিবার বিকেলে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাবুর মরদেহ দেশে আনা হয়। সীমান্তে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে সাভারের উদ্দেশে রওনা দেন। রাত তিনটার দিকে তাঁরা সাভারে পৌঁছান।
আজ সকাল সোয়া নয়টার দিকে আমিনবাজারের হাজিবাড়ী মসজিদের সামনে থেকে লাশবাহী গাড়িতে করে বাবুর মরদেহ নেওয়া হয় হিজলা পাঁচ মসজিদ মাঠে। সেখানে জানাজা শেষে তাঁকে আমিনবাজার বড়দেশী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
বাবুর বন্ধু মো. ইব্রাহীমও জানাজায় অংশ নেন। বাবুর সঙ্গে একাধিকবার ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। ওই হোটেল নিয়েও তাঁর সঙ্গে আগে কথা হয়েছিল।
ইব্রাহীম বলেন, ‘বাবু আর আমি একসঙ্গে ইন্ডিয়া অনেকবার গিয়েছি। শেষবার যখন গেছিলাম, ওই হোটেলের এসিতে আগুন লেগেছিল। তখনই আমি বাবুকে বলেছিলাম, “তুই আর এই হোটেলটায় উঠিস না।” হোটেলটা ভাঙাচোরা, দুর্বল, নোংরা পরিবেশ-ভালো না।’
বন্ধুর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইব্রাহীম। তিনি বলেন, ‘মানুষটা খুব ভালো ছিল। এভাবে চলে যাবে, কখনো ভাবিনি।’
কলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে বাবুর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সরকারি সহায়তার প্রত্যাশা করছেন গুলশানারা।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সাভার উপজেলার আমিনবাজার ইউনিয়নের বেগুনবাড়ী শিকদারপাড়া (আব্বাসের বাড়ির সংলগ্ন) এলাকার মৃত আদম আলীর চার ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন আহমেদ বাবু। তিনি আমিনবাজারের এম এ হোসেন টাওয়ারের মসজিদ মার্কেটে অবস্থিত ‘কিউট কসমেটিক্স’ দোকানের স্বত্বাধিকারী। দীর্ঘ দুই বছর পর ভারতের ভিসা পেয়ে গত সোমবার (১৭ই আগস্ট) রাতে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক মালামাল কিনতে তিনি কলকাতায় যান। সেখানে পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন ‘শিখা ইন’ নামে একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি। ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে নয়জন বাংলাদেশী প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যেই একজন আহমেদ বাবু। সেদিন দুপুরে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিবারকে অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর বিষয়টি অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে অফিসিয়াল ছবি পাঠানো হলে স্বজনরা নিহত আহমেদ বাবুর পরিচয় নিশ্চিত করেন। আহমেদ বাবু স্ত্রী, নয় বছরের এক কন্যা সন্তান ও চার বছরের একটি ছোট শিশুসন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।