দিনাজপুর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঘাগড়া ক্যানেলের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬০ ফুট। আর গিরিজা ক্যানেলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার ও প্রস্থ প্রায় ৩৫ ফুট। দীর্ঘদিন ধরে শহরের পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ক্যানেল দুটি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহরের পানি নিষ্কাশন ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে প্রায় চারশ বছর আগে তৎকালীন মহারাজা গিরিজানাথের উদ্যোগে ক্যানেল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যানেল দুটির পুনঃখননের কাজ শুরু হয়।
কালের বিবর্তনে শহরের জনবসতি ও স্থাপনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যানেল দুটির ওপরও পড়তে থাকে মানুষের চাপ। বিভিন্ন স্থানে ক্যানেলের জায়গা দখল করে দেয়াল, বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি স্থাপনাও ক্যানেলের জায়গা সংকুচিত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দখল উচ্ছেদ, এরপর আবারও দখল-দূষণ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পৌরসভার সমন্বয়ে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রাণনাথপুর, বালুবাড়ী, খামারকাচাই, উত্তর ফরিদপুর, খামারঝাড়বাড়ী, পাহাড়পুর, কসবা ও কাঞ্চন মৌজায় জরিপ চালিয়ে ৪২৮ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করে।
তালিকায় ক্যানেলের জায়গায় থাকা ৬৩টি সেমিপাকা বাড়ি, ১০৬টি টিনশেড ঘর, চারটি দ্বিতল ভবন ও একটি একতলা ভবনের তথ্যও উঠে আসে। পরে ২৪ ডিসেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। উচ্ছেদ শেষে ঘাগড়া ক্যানেলের সংস্কারে প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
তবে কয়েক বছর না যেতেই আবারও আগের চিত্র ফিরে আসতে শুরু করেছে। ক্যানেলের দুই পাড়ের বাসাবাড়ি থেকে পাইপের মাধ্যমে ময়লা ও বর্জ্য ক্যানেলে ফেলা হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য স্থাপনার বর্জ্যও কোথাও কোথাও সরাসরি পানিতে পড়ছে। এতে পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং বিভিন্ন অংশে পলি ও বর্জ্য জমে ক্যানেলের গভীরতা কমে যাচ্ছে।
বাড়ছে মশার উপদ্রব, শঙ্কা জলাবদ্ধতার
দূষিত ও স্থবির পানিতে মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্যানেলের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষাকালে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
দিনাজপুর পৌর শহরের বাসিন্দা মো. নিয়ামত আলী বলেন, একসময় ক্যানেল দুটি নৌকা চলাচলের মতো প্রশস্ত ছিল। মানুষের অসচেতনতা ও প্রশাসনের যথাযথ নজরদারির অভাবে এখন ক্যানেলের অবস্থা নাজুক। নিয়মিত ময়লা ফেলার পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর বর্জ্যও ক্যানেলে ফেলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্যানেল দুটি দ্রুত দখলমুক্ত ও সংস্কার করা না হলে দিনাজপুর শহরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাবে ঐতিহাসিক এই জলপথ।
সংস্কারের নতুন উদ্যোগ
দিনাজপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মিনারুল ইসলাম খান জানান, শহরের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা ও ক্যানেলগুলো দূষণমুক্ত করতে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্যানেল দুটি দখলমুক্ত ও সংস্কার করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্যানেলের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং নিয়মিত তদারকির স্থায়ী ব্যবস্থা করা হবে। তাদের মতে, শুধু একবার সংস্কার নয়—দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলেই রক্ষা পেতে পারে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক ঘাগড়া ও গিরিজা ক্যানেল।
ঐতিহ্যের এই দুই জলধারা রক্ষা করা এখন শুধু সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়; এটি দিনাজপুর শহরের পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।