অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটি মূলত তিনটি সুসংগঠিত স্তরে কাজ করে। প্রথম স্তরে থাকে ‘এজেন্ট’, যারা ফেসবুক ও মাঠপর্যায়ে অভাবী ও ঋণগ্রস্ত মানুষকে টাকার লোভ দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করায়। দ্বিতীয় স্তরে থাকে ‘ফিক্সার্স’, যারা পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ করে। বর্তমানে ভারতের ভিসা জটিল হওয়ায় চক্রটি করাচিকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। তৃতীয় স্তরে পাকিস্তানে থাকে ‘রানার্স’, যারা বিমানবন্দর থেকে দাতাকে রিসিভ করে গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়।
চক্রের মূল হোতা বা ‘কিংপিন’রা অবস্থান করে পাকিস্তানে। তারা ক্রেতা সংগ্রহ করে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ককে কার কত কিডনি লাগবে তা জানিয়ে দেয়। প্রতিটি কিডনি ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি হলেও দাতা পান মাত্র ৪-৫ লাখ টাকা।
ফেসবুকে ‘কিডনি ডোনার গ্রুপ’ বা ‘কিডনি ক্রয়-বিক্রয়’ নামে অর্ধশতাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। কয়েকটিতে সদস্য সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যেই কোড ওয়ার্ড ব্যবহার করে চলছে এই অবৈধ লেনদেন। ও-পজিটিভ বা ও-নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের কিডনির চাহিদা ও দাম সবচেয়ে বেশি, যা ক্ষেত্রবিশেষে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, এই চক্রটি ‘স্লিপার সেলের’ মতো কাজ করে, যার ফলে মূল হোতাদের ধরা কঠিন। তবে অনুসন্ধানে পাচার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক যোগসাজশের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। গত ২৬ মার্চ শাহজালাল বিমানবন্দরে এক যুবককে জোরপূর্বক পাকিস্তানে পাঠানোর সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ভুয়া পরিচয় দিয়ে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিমানবন্দর থানায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত প্রভাবশালী ওই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
গোয়ালন্দের ২৪ বছর বয়সী আরিফুল ইসলামের অভিজ্ঞতা শিউরে ওঠার মতো। ঋণের চাপে ৫ লাখ টাকায় কিডনি দিতে রাজি হয়ে করাচি যাওয়ার আগমুহূর্তে তিনি জানতে পারেন, অপারেশন শেষে তাকে আর দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে আরিফুলের আকুতি তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, আর্থিক অনটন ও মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে মানুষ এই ফাঁদে পড়ছে। ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী পরিবারের বাইরে অঙ্গ দান বা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অপরাধে ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া বিদেশে পাচারের বিষয়টি ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’ অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ।