বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার দেবৎপুর মাঝপাড়া গ্রামে অবস্থিত প্রায় পাঁচ শত বছরের পুরনো তিন গম্বুজ মসজিদটি আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে। স্থানীয় জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকা এই মসজিদ আমাদের অতীত গৌরবের স্মৃতি বহন করছে।
১৫শ শতক বা ১৬শ শতাব্দীতে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সে সময় মুঘল সাম্রাজ্য উত্তর ভারত দখল করলেও বাংলায় মুসলিম স্থাপত্যের আলাদা বৈশিষ্ট্য বিকশিত হচ্ছিল। স্থানীয় শাসকগণ কিংবা কোনো সম্ভ্রান্ত মুসলিম ব্যক্তি দেবৎপুর অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রচারের উদ্দেশ্যে মসজিদটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। তবে মসজিদ নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট নাম ও নির্মাণ সাল আজও ইতিহাসের অন্ধকারে রয়ে গেছে।
মসজিদটি একটি আয়তাকার নকশায় তৈরি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি গম্বুজ, যা পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত। মাঝখানের গম্বুজটি আকারে কিছুটা বড় এবং দৃষ্টিনন্দন। গম্বুজগুলো মোটা ও মজবুত স্তম্ভের উপর স্থাপিত, যা গম্বুজের ভার বহন করে। দেয়ালগুলি প্রায় এক মিটার পুরু এবং ইট ও চুন-সুরকি দ্বারা নির্মিত। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে, প্রতিটি দরজা খিলানাকৃতি। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালেও ছোট ছোট জানালা রয়েছে, যা আলো ও বাতাস চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হত।
মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সুন্দর মেহরাব স্থাপিত আছে। মেহরাবের চারপাশে কিছু টেরাকোটা অলংকরণ দেখা যায়, যদিও সময়ের বিবর্তনে অনেক অংশ ঝুঁকে পড়েছে। অভ্যন্তরের মেঝে আগে হয়তো পাথর বা চুন দ্বারা মোজাইক করা ছিল, এখন তা মাটির সাথে মিশে গেছে। স্থাপত্যের নিরিখে এই মসজিদে বাইরের দেয়ালে কিছু স্থানে খোদাই করা লতাপাতা ও ফুলের মোটিফ পাওয়া যায়। এ ধরনের কারুকাজ প্রাচীন বাংলার মুসলিম শিল্পকলার পরিচায়ক।
দেবৎপুর মাঝপাড়ার এই মসজিদ স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না, বরং ধর্মীয় শিক্ষা, বিচারসভা ও সামাজিক সমাবেশেরও কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ঈদ, রমজান ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই মসজিদ ছিল প্রাণের স্পন্দন। অনেক প্রাচীন আলেম-ওলামা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এখানে ধর্মীয় পাঠদান করতেন, যা গ্রামীণ সমাজে ইসলামি জ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমানে মসজিদটির কিছু অংশ ক্ষয়ে গেছে। গম্বুজের কিছু অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালে শৈথিল্য এসেছে এবং পরিবেশগত কারণে ইটের গায়ে শৈবাল ও শিকর জন্ম নিচ্ছে। শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বিউটি বেগম ও স্থানীয় জনগণ নিজেদের উদ্যোগে সংরক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, পাশাপাশি পূর্ব পার্শ্বে সংস্কার করে মুসল্লিদের ইবাদত বন্দেগির জায়গা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মসজিদ থেকে প্রায় পাচঁ শত গজ পূর্বে একটি বিনোদন কেন্দ্র ”বিউটি পার্কএন্ড রির্সোট ” নির্মিত হওয়ায় অনেক দর্শনার্থীরা মসজিদটি এক নজর দেখতে আসেন। মসজিদটিকে ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে ইতিহাসপ্রেমী এখান থেকে বাংলার প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য সম্পর্কে জানতে পারেন।
দেবৎপুর মাঝপাড়া তিন গম্বুজ মসজিদের সভাপতি মোঃ জাহেদুর রহমান রহমান মুসা বলেন. প্রায় পাচঁ শত বছরের এই মসজিদটি আমার পূর্ব পুরুষের জমিতে মুঘল আমলে স্থাপিত হয়। মসজিদটি আজও মুঘল আমলের ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে মুসুল্লী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মসজিদের মূল কাঠামো টিক রেখে পুর্বদিকে কিছু অংশ প্রশস্ত করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বিউটি বেগম বলেন, দেবৎপুর মাঝপাড়ার তিন গম্বুজ মসজিদ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সামনে। এটি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, বরং আমাদের পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং নান্দনিকতার জীবন্ত প্রমাণ। এখন সময় এসেছে এই ঐতিহাসিক সম্পদকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই গৌরবের অংশীদার হতে পারে।