সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেমাইমা বলেন, পাকিস্তান সরকারকে অবশ্যই দেশটির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ইমরানকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তাঁর দীর্ঘদিনের একাকী বন্দিত্বের অবসান ঘটাতে হবে।
গত ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে একটি চিকিৎসা বোর্ডের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা দেওয়ার কথা ছিল।
তবে জেমাইমার অভিযোগ, সরকার ইমরানকে শিফা হাসপাতালে না নিয়ে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) চিকিৎসা করায়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে সুস্থ ঘোষণা করলে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে গত শনিবার সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আদালত অবমাননার পিটিশন দায়ের করে দলটি।
‘যুক্তরাজ্য আর কত দিন নীরব থাকবে?’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে জেমাইমা বলেন, ‘যুক্তরাজ্য আর কত দিন নীরব থাকবে?’
ইমরানের সাবেক স্ত্রী অভিযোগ করেন, প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে থাকা ইমরানকে দীর্ঘ সময় একাকী রাখা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আইনজীবী ও চিকিৎসকদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ সীমিত করা হয়েছে।
জেমাইমার দাবি, ইমরানের পরিবারের সদস্যদের প্রায় ১০ মাস ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা বিধির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ওই বিধি অনুযায়ী টানা ১৫ দিনের বেশি একাকী বন্দিত্ব নিষিদ্ধ।
জেমাইমা বলেন, ইমরানের চিকিৎসা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছেন। আদালত তাঁকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পরিবারের নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং দুই ছেলের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁর।
দুই ছেলেকেও বাবার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি
ইমরানের দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিম খানের পক্ষ থেকেও আবেদন জানিয়েছেন জেমাইমা। তিনি বলেন, হাজার হাজার মাইল দূর থেকে তাঁরা তাঁদের বাবার স্বাস্থ্যের অবনতি দেখছেন।
জেমাইমার অভিযোগ, তাঁর দুই ছেলেকে ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তাঁদের ভিসা দেওয়া হয়নি এবং পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তাঁদের গ্রেপ্তারের হুমকিও দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলার সুযোগও তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
জেমাইমা আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, তাঁর দুই ছেলে বাবাকে দেখতে পাকিস্তানে গেলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হলেও যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করবে না।
ইমরানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন জেমাইমা। তিনি জানান, ইমরান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং কয়েক বছর ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেছেন। পাকিস্তানে প্রথম বিনা মূল্যের ক্যানসার হাসপাতাল ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ছেলেদের অভিযোগ অস্বীকার পাকিস্তানের
আগস্টের শুরুতে কাসিম ও সুলায়মানও তাঁদের বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁরা দাবি করেন, কয়েক মাস ধরে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।
তাঁদের দাবি, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তাঁরা বাবাকে দেখেননি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করলেও কোনো উত্তর পাননি।
তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় তাঁদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, কাসিম ও সুলায়মানের বিদেশি পাকিস্তানিদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে ভিসা ছাড়াই পাকিস্তানে প্রবেশ করা যায়। তবে ইমরানের ছেলেদের বক্তব্য, তাঁদের পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং সেগুলো নবায়ন করা হয়নি।
এর আগে গত ২৬ মার্চ জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে কাসিম খান তাঁর বাবার মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি ইমরানকে দীর্ঘদিন একাকী বন্দিত্বে রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের তাঁর সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়ার অভিযোগ করেন।
ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। বর্তমানে ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতি মামলায় তিনি আদিয়ালা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৯ মে সংঘটিত বিক্ষোভের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।