ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু রৌহা ইউনিয়নেই এ প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করে প্রায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। জেলার অন্যান্য উপজেলা মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে ‘স্টারলিংক’-এর প্রচারণা চালানো হতো। প্রচারণায় বলা হতো, এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার প্যাকেজে বিনিয়োগ করে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক ভিডিও দেখলেই আয় করা যাবে।
শুরুতে টাকা তুলে বিশ্বাস, পরে ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, শুরুতে অনেকে বিনিয়োগের টাকা ও মুনাফার অংশ সহজেই তুলতে পারায় প্ল্যাটফর্মটির প্রতি তাদের আস্থা তৈরি হয়। পরে সেই বিশ্বাসে নিজেরা আরও বেশি টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি বন্ধু, স্বজন ও পরিচিতদেরও যুক্ত করেন।
তবে কয়েক দিন পর টাকা উত্তোলনের আবেদন ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’ দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা। একপর্যায়ে টাকা তুলতে হলে নির্দিষ্টসংখ্যক নতুন সদস্য রেফার করার শর্ত দেওয়া হয় বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এলন মাস্কের স্টারলিংক’ বলে প্রচারণা
রৌহা ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী ‘রাহিদ’ (ছদ্মনাম) জানান, এলাকার কয়েকটি অনলাইন গ্রুপে ‘স্টারলিংক’-এর প্রচারণা চালানো হতো। সেখানে দাবি করা হতো, এলন মাস্কের স্টারলিংক বাংলাদেশে নতুন একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু করছে।
তিনি জানান, এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার প্যাকেজে বিনিয়োগ করে প্রতিদিন দুটি ভিডিও দেখলেই টাকা পাওয়া যাবে বলে প্রচার করা হয়। শুরুতে তিনি ৫০০ টাকা পর্যন্ত সহজেই উত্তোলন করতে পেরেছিলেন। এতে তার বিশ্বাস তৈরি হয়। পরে তিনি বন্ধু ও পরিচিতদেরও প্ল্যাটফর্মটিতে যুক্ত করেন। সব মিলিয়ে তিনি ও তার পরিচিতজনেরা প্রায় এক লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করেন।
নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্ত
আরেক ভুক্তভোগী ‘ইয়াসিন’ (ছদ্মনাম) বলেন, শুরুতে টাকা জমা দেওয়ার ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই বিনিয়োগের টাকা বা মুনাফার অংশ পাওয়া যেত। এতে অনেকে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন।
তবে পাঁচ-সাত দিন কিংবা দুই সপ্তাহ পর টাকা তুলতে গেলে ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’ দেখানো শুরু হয়। পরে টাকা উত্তোলনের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক নতুন সদস্য রেফার করার শর্ত দেওয়া হয়। নতুন কেউ এক হাজার টাকা জমা করলে ১০ শতাংশ কমিশন দেওয়ার কথাও বলা হতো বলে জানান তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নতুন সদস্য যুক্ত করার বিষয়টি ছিল প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুরুতে যুক্ত হওয়া কেউ কেউ বিনিয়োগের টাকা ও কিছু মুনাফা তুলতে পারায় তারা নিজেরাই অন্যদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া অনেকেই আর টাকা তুলতে পারেননি। ফলে প্রথম দিকে যুক্ত কিছু সদস্য লাভবান হলেও পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া বড় একটি অংশ বিনিয়োগের অর্থ হারিয়েছেন।
সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন জানান, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা, পরিচিতজনদের সঙ্গে বিরোধ এবং নিজেরাই অন্যদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করায় দায়ী হওয়ার ভয় থেকে তারা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে চাইছেন না।
দ্রুত লাভের প্রলোভনে প্রতারণার ফাঁদ
সমাজকর্মী মৃণাল কান্তি চক্রবর্তী বলেন, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দ্রুত বেশি লাভের প্রলোভনে তরুণরা এসব প্ল্যাটফর্মে টাকা বিনিয়োগ করছেন। পরে নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্তে তারা এক ধরনের জালে আটকে যাচ্ছেন। এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অভিভাবক ও সচেতন মহলকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
ফ্রিল্যান্সার ও আইটি বিশেষজ্ঞ মো. আনোয়ার হাসান বলেন, অনলাইন স্ক্যামচক্রগুলো লোভনীয় অফার ও সহজে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। শুরুতে নানা সুবিধার আশ্বাস দিলেও একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। এটি প্রতারণামূলক কার্যক্রম।
অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের
এ বিষয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল প্রতারণার বিষয়ে পুলিশ নিয়মিত সচেতনতামূলক বার্তা দিয়ে থাকে। কেউ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অথবা লিখিত অভিযোগ করতে পারেন।
তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট ইউনিটের মাধ্যমে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতারণায় ব্যবহৃত ডিভাইস প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমে শনাক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব।