ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৪৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন পাঁচজন। মৃতদের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন এবং জুলাই মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। গত বছরও এ সময় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ১৭৬ জন এবং মারা যান একজন। অথচ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—মাত্র পাঁচ মাসে ভর্তি হন ২ হাজার ২২৭ জন রোগী। এ সময়ে মৃত্যু হয় ২৮ জনের।
২০ শয্যার ওয়ার্ডে ৩৯ রোগী, মেঝেতেও চিকিৎসা
রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় গত ২ জুলাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়। তবে ২০ শয্যার ওই ওয়ার্ডে বুধবার (২২ জুলাই) সকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৯ জন রোগী। ফলে শয্যার সংকটে অনেক রোগীকেই মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ জুলাই থেকে ২২ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ২৪২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১০৩ জন ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। ভর্তি রোগীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার। নগরের নওমহল, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার ও বাউন্ডারি রোড এলাকা থেকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বুধবার সকাল ৭টা পর্যন্ত হাসপাতালে ৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১০ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন।
ডেঙ্গুর হটস্পট নগরের ছয় ওয়ার্ড
ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি বিবেচনায় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নগরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। জুনে আক্রান্ত হন আটজন। এরপর ২১ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৫৮ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছর নগরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ জনে। এর মধ্যে মারা গেছেন একজন।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ছয়টি ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় দিনে দুই দফা মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফগিংয়ের পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে স্প্রে করা হচ্ছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
তবে নগরের নওমহল, আকুয়া ও আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত মশকনিধন ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। ফলে ডেঙ্গু নিয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
আকুয়া দরবার শরিফ রোড এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আবদুল আউয়াল বলেন, আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পর তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। একপর্যায়ে তার প্লাটিলেট কমে ৬৮ হাজারে নেমে আসে।
অন্যদিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রাকিব হোসেন কাজের জন্য গাজীপুরে গিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তাকে চার ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে।
‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল প্রস্তুত’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাইনউদ্দিন খান বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত রাখতে হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে।
উপজেলাতেও বাড়ছে ডেঙ্গু, চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৫ জন
শুধু ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, জেলার উপজেলা পর্যায়েও ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে জেলার ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জুলাই পর্যন্ত ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে পাঁচজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় জেলার সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নতুন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের মতো ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কার্যকর মশকনিধন কর্মসূচি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় আগামী কয়েক মাসে ময়মনসিংহে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।