দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে বন্য প্রাণীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বন্য প্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সময়মতো সতর্কবার্তা পাঠায় এআই প্রযুক্তি। ফলে বন্য প্রাণী যেমন নিরাপদ থাকছে, তেমনি মানুষও বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারছে।
সম্প্রতি এআই ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ফুটেজ ভাইরাল হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের জলদাপাড়ার কাছে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দেখিয়েছে যে কিভাবে এআই-চালিত নজরদারি ক্যামেরা এবং বন কর্মীদের দ্রুত পদক্ষেপ মানুষ ও হাতির সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে সাহায্য করেছে। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস কর্মকর্তা পারভীন কাসওয়ানের শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা গেছে, কিভাবে হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে এবং বন্য প্রাণী ও কাছাকাছি জনবসতি, উভয়কেই রক্ষা করতে মাঠ পর্যায়ে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
কাসওয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত ২৬ জুলাই রাত আনুমানিক ১২:৩২ মিনিটে, যখন এআই-সক্ষম নজরদারি ক্যামেরাগুলো বনের সীমানা থেকে একটি হাতির দলকে কাছের একটি গ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে শনাক্ত করে। সিস্টেমটি সঙ্গে সঙ্গেই এই গতিবিধি চিহ্নিত করে এবং বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে একটি স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠায়।
১৫ মিনিটের মধ্যে একটি কাছাকাছি থাকা র্যাপিড রেসপন্স টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা হাতির দলটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এবং সেগুলোকে গ্রামে ঢুকতে বাধা দিয়ে মানুষ ও হাতির একটি সম্ভাব্য সংঘাত সফলভাবে এড়িয়ে দেয়।
২৮ জুলাই নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি শেয়ার করে পারভীন কাসওয়ান লিখেছেন, ‘এটি আমাদের একটি রুটিন কাজ। প্রতিদিন রাতে আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা এ ধরনের একাধিক সতর্কবার্তা এবং জনসাধারণের কলের জবাব দেন, যা মানুষ এবং বন্য প্রাণী উভয়কেই রক্ষা করে।’
ভিডিওটিতে দেখা যায়, হাতির দলটি অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, যা নাইট-ভিশন নজরদারি ক্যামেরায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এআই সিস্টেমটি হাতির দলটিকে শনাক্ত করে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অ্যালার্ট জারি করে। ফলে বন্য প্রাণীগুলো মানুষের বসতিতে পৌঁছানোর আগেই কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পান।
এই ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে এবং অনেক ব্যবহারকারী বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ব্যবহারের প্রশংসা করেছেন। অনেকেই এই প্রযুক্তিকে জননিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এআইয়ের ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তারা বনকর্মীদের দ্রুত প্রতিক্রিয়ারও প্রশংসা করেছেন, যারা এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাত জেগে কাজ করেন।
একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এটি খুবই চমৎকার। এআইয়ের সঠিক ব্যবহার সত্যিই দারুণ সুবিধা নিয়ে আসে।’ অন্য একজন বলেছেন, ‘আপনাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারত, কিন্তু সব কিছু খুব সুন্দরভাবে সামলানো হয়েছে। অনেক জীবন বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ।’
ভাইরাল ভিডিওটির কারণে বিষয়টি এখন আলোচনায় এলেও ভারতে অনেক দিন ধরেই বন্য প্রাণী সংরক্ষণে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুর ও মাদুক্কারাই বনাঞ্চলে এআই-চালিত থার্মাল ক্যামেরা সিস্টেম চালু রয়েছে। এই সিস্টেমটি বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেললাইনের দিকে হাতি এগিয়ে এলে চালক ও বন বিভাগকে আগেভাগেই সতর্ক করে দেয়। চালুর পর থেকে এই সিস্টেমটি ৬ হাজার ৫৯২ বারেরও বেশি সম্ভাব্য দুর্ঘটনা বা সংঘাত এড়াতে সাহায্য করেছে এবং এর ফলে সেখানে হাতির মৃত্যুর হার শূন্যে নেমে এসেছে। ওড়িশার রাউরকেলাতেও একইভাবে রেললাইনের কাছে চলে আসা হাতির দল বা শাবকদের এআই ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করে ট্রেন থামিয়ে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। আসামের কাজী রঙা জাতীয় উদ্যানের আশপাশের গ্রামে হাতির ডাক শনাক্ত করতে এবং বাঘের গর্জন বা মৌমাছির আওয়াজ তৈরি করে হাতিকে গ্রামের লোকালয় থেকে দূরে রাখতে বিশেষ এআই অডিও ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে।