এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতানিয়াহুর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণে তিনি ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড, আঞ্চলিক সংঘাত এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কক্ষে বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের অনুপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এর আগে বিভিন্ন বছরেও তার বক্তব্যের সময় প্রতিনিধিদের কক্ষ ত্যাগ করার ঘটনা ঘটেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তার জাতিসংঘের ভাষণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমর্থকদের কেউ কেউ বক্তব্যটির প্রশংসা করেছেন। ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এর সম্পাদক জিভিকা ক্লাইনও ভাষণটির প্রশংসা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী মিচেল বারাকও তার বক্তব্যের প্রভাব নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছেন, ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তার সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নেতানিয়াহু ও তার সরকার বরাবরই ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং হামাসসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরে আসছে।
গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, যুদ্ধবিরতি এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে জাতিসংঘ বারবার আহ্বান জানালেও সংস্থাটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত।
অন্যদিকে, ইসরায়েল জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ করে আসছে। বিশেষ করে ইউএনআরডব্লিউএকে হামাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে দেশটি। সংস্থাটি এসব অভিযোগের পর নিজেদের কার্যক্রম ও কর্মীদের বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরোয়ানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো রাষ্ট্র বা নেতাকে নিষিদ্ধ করে না। জাতিসংঘ ও আইসিসি পৃথক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের এখতিয়ারও ভিন্ন।
ফলে নেতানিয়াহুর জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাকে একদিকে যেমন ইসরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তার দিকটিও আলোচনায় এসেছে। তবে তার বক্তব্য কতটা ইসরায়েলি ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলবে বা তা নির্বাচনে কী ধরনের ফল বয়ে আনবে—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য আলাদা করে প্রয়োজন।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও একই সঙ্গে দুটি প্রশ্ন সামনে থাকে—একদিকে যুদ্ধ ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় সংস্থাটির কার্যকারিতা, অন্যদিকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সীমাবদ্ধতা। গাজা ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।