জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো জ্বালানি আমদানির ওপর উচ্চ নির্ভরতা। বৈশ্বিক সংঘাত বাড়লে তেল ও গ্যাসের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। অতীতে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের যেকোনো সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানি খাতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমবে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা জরুরি
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। কিন্তু বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে শ্রমবাজারেও প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারকে নতুন শ্রমবাজার খোঁজার উদ্যোগ নিতে হবে। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ জোরদার করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সেই বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
খাদ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রস্তুতি
বিশ্বব্যাপী সংঘাতের কারণে অনেক সময় খাদ্যশস্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। অতীতে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় গম, ভোজ্যতেল ও সার বাজারে তার প্রভাব স্পষ্ট দেখা গেছে। বাংলাদেশকে তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে।
স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকদের সহায়তা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত খাদ্য মজুত শক্তিশালী করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আমদানির উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন, যাতে কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমে।
আর্থিক শৃঙ্খলা ও সঞ্চয় বাড়ানো
বৈশ্বিক সংকটের সময় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারকে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্ক হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি।
আগাম প্রস্তুতিই সুরক্ষা
বিশ্ব পরিস্থিতি যে অনিশ্চিত, তা স্পষ্ট। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করলে সম্ভাব্য ঝুঁকি অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব। জ্বালানি নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স প্রবাহ, খাদ্য মজুত এবং আর্থিক শৃঙ্খলা—এই চারটি খাতে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া গেলে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকতে পারবে।
অতএব, সংকটের অপেক্ষা না করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পথ। কারণ ইতিহাস বলছে, যে দেশগুলো আগে সতর্ক হয়, তারাই সংকট কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।