২০২৪ সাল থেকে প্রতি বছর জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট (মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আসছে নেপাল। দেশটি আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে চায়। তবে চলতি বছরের জুনে ভারত-বাংলাদেশ আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনা করা ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানটি নেপালের এই অনুরোধ নাকচ করে দেয় বলে নেপাল সরকারের কর্মকর্তারা দ্য কাঠমান্ডু পোস্টকে জানিয়েছেন। এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি ভারত-বাংলাদেশ সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে অনুরোধটি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানা গেছে।
জুলাইয়ে নেপালের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করে ভারত। দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে কোনো সমাধান হয়নি।
তিন দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের সম্মিলিত স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৫৮৬ গিগাওয়াট। সেই তুলনায় ২০ মেগাওয়াট খুবই সামান্য। কিন্তু তিন দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকেরা ডায়ালগ আর্থকে বলেছেন, এই ২০ মেগাওয়াট নিয়ে অচলাবস্থার বিষয়টি যতটা ছোট মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা আরও জটিল। এর পেছনে কারিগরি, প্রক্রিয়াগত এবং রাজনৈতিক-তিন ধরনের বিষয়ই রয়েছে।
বাংলাদেশ ও নেপালের বিশেষজ্ঞরা ভারত–বাংলাদেশ সঞ্চালন সংযোগে অব্যবহৃত সক্ষমতা থাকার কথা বলছেন। তবে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, ওই সঞ্চালন লাইনে সত্যিই সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তাঁদের মতে, জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য আঞ্চলিক কোনো সংস্থা বা নির্দিষ্ট বাণিজ্যব্যবস্থা না থাকায় প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে জলবিদ্যুৎ রপ্তানিকারক হিসেবে নেপালের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার সঙ্গে দেশটির দুর্বলতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। ২৬ আগস্ট আকস্মিক বন্যায় নেপালের ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অন্তত ৯০০ মানুষ মারা যান। ইন্ডিয়া টুডের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ১২টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চালন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, প্রায় ৩৬০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে নেপাল ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ চাইতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন। এই বিপর্যয় নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কেন নেপালের জলবিদ্যুৎ চায়
নেপাল ও বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদার ধরন পরস্পরের পরিপূরক। গ্রীষ্মের মৌসুমে নেপালে বর্ষার কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে যায় এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ তৈরি হয়। সেই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ তার জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে ব্যবহার করতে পারে। শুষ্ক শীত মৌসুমে পরিস্থিতি কিছুটা উল্টো হয়-তখন নেপালে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়, আর বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। ফলে সারা বছর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য হলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
নেপাল এনার্জি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালে নেপালের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১ গিগাওয়াট। অথচ মাসিক সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ২ দশমিক ৫ গিগাওয়াট। বিদ্যুৎ রপ্তানি ধরলে মোট চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ২ গিগাওয়াটে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ গিগাওয়াট। জ্বালানি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বারের তথ্য অনুযায়ী, এর ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বর্তমান চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ বিদ্যুতের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে চায়। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ অনা-আমদানিনির্ভর নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্যও রয়েছে বাংলাদেশের।
ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশে বিদ্যুতের অনেক প্রচলিত উৎসের তুলনায় কম খরচে সরবরাহের সুযোগ তৈরি করতে পারে।’
চৌধুরী বলেন, ‘আদর্শভাবে বিদ্যুৎ বাণিজ্য দুই দিকেই হওয়া উচিত।’ তবে এই বাণিজ্য বাড়ানো ‘একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ বলেও তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, ‘পরিমাণটা ছোট, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ সহযোগিতার সূচনা হিসেবে কাজ করছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাংলাদেশকে মূলত জ্বালানি সরবরাহে ভূরাজনৈতিক বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
তবে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে না। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আমদানি করা বিদ্যুৎকে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তাঁর আশা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে দেশের বেসরকারি খাত ‘অগ্রণী ভূমিকা’ পালন করবে। কারণ, ‘বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা রয়েছে’।
নেপালের জন্য অবশ্য বিদ্যুৎ বাণিজ্যের লক্ষ্য আরও বড়। জুলাইয়ের জ্বালানি সহযোগিতা আলোচনায় ভারত তার বিদ্যুৎ আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নেপালও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। নেপালের জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজভক্ত শ্রেষ্ঠা ডায়ালগ আর্থকে বলেন, ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে করা ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির চুক্তি বাস্তবায়নের পথে এটি আরেকটি পদক্ষেপ।
নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির তাৎক্ষণিক সমস্যাটি নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ‘হারানো সংযোগ’ ভারতের হাতে
নেপাল বর্তমানে বাংলাদেশে যে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে, তা ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকে বাহারামপুর–ভেড়ামারা উচ্চ ভোল্টেজের ডিসি আন্তসংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসে। ভারতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে একটি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ওই বিদ্যুৎ আসে।
ভারত–বাংলাদেশের বাহারামপুর–ভেড়ামারা সঞ্চালন সংযোগের বিদ্যুৎ পরিবহন সক্ষমতা ১ গিগাওয়াট। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই সংযোগ দিয়ে সাধারণত প্রায় ৯২০ থেকে ৯৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। ফলে কিছু অব্যবহৃত সক্ষমতা থাকার কথা।
নেপাল বিকল্প পথও বিবেচনা করছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোজ সিলওয়াল বলেন, ‘বাহারামপুর–ভেড়ামারা লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ রপ্তানি করা সম্ভব না হলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত ভারতের অন্য সঞ্চালন লাইন দিয়েও নেপাল অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারে।’
বাহারামপুর–ভেড়ামারা সংযোগ ছাড়াও ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১ দশমিক ৭ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে। এর মধ্যে সূর্যমণিনগর–কুমিল্লা আন্তসংযোগ দিয়ে ১৬০ মেগাওয়াট এবং আদানি পাওয়ার পরিচালিত গোড্ডা–রোহনপুর সংযোগ দিয়ে ১ দশমিক ৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে।
তবে বিদ্যমান সঞ্চালন করিডর ব্যবহার করে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরিবহন করা বাস্তবে সম্ভব নাও হতে পারে বলে মনে করেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির জ্বালানি দক্ষতা বিশেষজ্ঞ নিকিত অভ্যাঙ্কর। তাঁর মতে, এসব করিডর পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
অভ্যাঙ্কর আরও বলেন, একটি সঞ্চালন লাইন গড়ে যত পরিমাণ বিদ্যুৎ পরিবহন করে, সেটিই যে নিরাপদভাবে ব্যবহারযোগ্য মোট সক্ষমতা-বিষয়টি এমন নয়। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ অনেক বেশি হতে পারে। পাশাপাশি, বিদ্যুৎব্যবস্থার অন্য কোথাও আকস্মিক ত্রুটি দেখা দিলে তা সামাল দেওয়ার জন্যও কিছু সক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হয়।
অভ্যাঙ্কর বলেন, ‘তারা যদি আসলেই ১ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি লাইনকে ১ হাজার মেগাওয়াটে পরিচালনা করে, তাহলে আমি খুবই অবাক হব।’
বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সময় ক্ষতির কারণেও একটি লাইন তার নির্ধারিত সক্ষমতার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে না। বাহারামপুর–ভেড়ামারা সংযোগটি উচ্চ ভোল্টেজের ডিসি (এইচভিডিসি) ব্যবস্থা। এতে বিদ্যুৎ এসি থেকে ডিসিতে রূপান্তরের সময়, সঞ্চালন লাইনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এবং গ্রাহক প্রান্তে আবার ডিসিতে থেকে এসিতে রূপান্তরের সময় কিছু বিদ্যুৎ নষ্ট হয়। অভ্যাঙ্করের হিসাবে, ১ গিগাওয়াট সক্ষমতার একটি লাইনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ক্ষতি হতে পারে।
এ ছাড়া বাহারামপুর–ভেড়ামারা করিডর দিয়ে ভারতের নিজস্ব বিদ্যুৎ রপ্তানিও হয়। ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) ‘তাপীয় সীমার কাছাকাছি পর্যন্ত লাইনটি পরিচালনা করতে চায় না, এমন একটি লাইনে, যেটি ভারতের নিজস্ব দ্বিপক্ষীয় বিদ্যুৎ রপ্তানিও বহন করে’, বলেন সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (সিএসই) নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের উপপ্রোগ্রাম ব্যবস্থাপক বিনীত দাস।
অভ্যাঙ্কর বলেন, কম চাহিদার সময়ে যদি ওই সঞ্চালন লাইনে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকে, তাহলে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা (ব্যাটারি স্টোরেজ) ব্যবহার করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দিনের বিভিন্ন সময়ে আন্তসংযোগের বিদ্যুৎ প্রবাহ কতটা ওঠানামা করে তার ওপর।
বিদ্যুৎ বাণিজ্যে রাজনীতির জটিলতা
ভূগোলের কারণে ভবিষ্যতে নেপাল–বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারতের ভূমিকা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ভারতের কনজ্যুমার ইউনিটি অ্যান্ড ট্রাস্ট সোসাইটির (কাটস) নির্বাহী পরিচালক বিপুল চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘ভারতের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশ নেপাল বা ভুটান-কোনো দেশ থেকেই বিদ্যুৎ আনার আর কোনো উপায় নেই।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে এই অচলাবস্থা একটি পরীক্ষার মতো। একটি অভিন্ন সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমিত সক্ষমতা বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মধ্যে ভারত কীভাবে বণ্টন করে, এই ঘটনা তারই পরীক্ষা।
এই অচলাবস্থার মধ্যেই ভারত ও নেপাল আলাদাভাবে আরও বড় একটি সক্ষমতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুই দেশ নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানির সীমা ১ দশমিক ১ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৬৫ গিগাওয়াট করতে সম্মত হয়েছে।
সিএসইর বিনীত দাস বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয়ভাবে এই বড় সিদ্ধান্তটি যত দ্রুত হয়েছে এবং ত্রিপক্ষীয় ২০ মেগাওয়াটের বিষয়টি যত দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে আছে-এই দুইয়ের পার্থক্যই আঞ্চলিক একীভূতকরণের সমস্যাটি কোথায়, তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।’
নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতেও ভারতের ভূমিকা বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। ভারতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি নেপালে বড় বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে। একই সঙ্গে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানির প্রধান বাজার ভারত। আবার বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভারতই নেপালের ট্রানজিট দেশ।
চট্টোপাধ্যায় বলেন, ভারতের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় দেশটি নেপালের জলবিদ্যুতের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে পারে। তবে সব পক্ষের জন্য কার্যকর একটি কাঠামো তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘এটি তিন পক্ষের জন্যই লাভজনক হওয়া উচিত। এমন একটি মডেল তৈরি করা কঠিন নয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক আলোচনায় সেটি এখনো অনুপস্থিত।’
২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাও থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। তিনি এখনো ভারতে অবস্থান করছেন।
চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এখনো সঠিক পথে ফিরতে পারেনি। সম্পর্ক খুবই শীতল।’
দক্ষিণ এশিয়ায় কি বিদ্যুতের অভিন্ন বাজার হতে পারে?
মাত্র ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষেত্রেই যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা এমন একটি অঞ্চলে আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের বড় বাধাগুলোর দিকটি সামনে আনছে, যেখানে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
সঞ্চালন করিডরের আগের প্রতিটি সম্প্রসারণ-মূল ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির ব্যবস্থাসহ-প্রথমে জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) সিদ্ধান্ত এবং পরে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক করা হয়েছে। নেপাল–ভারত জেএসসির ১৩তম বৈঠক জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু জুলাইয়ের বৈঠকেও অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে কোনো সমাধান আসেনি।
এর বাইরে আরও বড় একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য করতে হলে, যদি সেই বিদ্যুৎ ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে যায়, তাহলে একাধিক স্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বিক্রয় চুক্তি, ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির অনুমোদন এবং সিদ্ধান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার জন্য একটি জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটি।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল বিদ্যুৎ বাণিজ্য উন্নয়নের জন্য ভারতের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। এপ্রিল পর্যন্ত ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে ১৭টি চুক্তি করেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১৩টি আন্তসীমান্ত প্রকল্প এবং ৩০টি সঞ্চালন সংযোগ প্রকল্পের সঙ্গেও ভারত যুক্ত।
সিএসইর বিনীত দাস বলেন, ত্রিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ লেনদেনে দ্বিপক্ষীয় লেনদেনের তুলনায় রাজনৈতিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা বেশি। এর ফলে এই অঞ্চলের বিদ্যুৎব্যবস্থাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হলেও বাস্তবে খণ্ডিত হয়ে আছে।
এই অঞ্চলের বিদ্যুৎব্যবস্থাকে আরও গভীরভাবে একীভূত করার সম্ভাব্য সুফল অনেক। কাটস ও চিন্তন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশগুলো একে অপরের বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পরিপূরক হতে পারে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে এবং বিদ্যুতের খরচও কমতে পারে।
তবে বিভিন্ন দেশের আকার ও বিদ্যুৎব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে তাদের স্বার্থও এক নয়। অভ্যাঙ্কর বলেন, ‘ভারতের মতো বড় একটি বিদ্যুৎব্যবস্থার ক্ষেত্রে ছোট পরিসরের আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য খুব বেশি পার্থক্য তৈরি করে না। কিন্তু নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য জলবিদ্যুৎ বিক্রি করা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো-দুই ক্ষেত্রেই আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ।’
তারপরও আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সমন্বয় ও সহযোগিতার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো কোনো উপ-আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান নেই। সিএসইর বিনীত দাসের মতে, একটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বিনিময় ব্যবস্থা, সবার জন্য সম্মত উন্মুক্ত সঞ্চালন সুবিধা (ওপেন-অ্যাকসেস) কাঠামো অথবা নির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা থাকলে তৃতীয় দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষেত্রে আরও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা না থাকলে, ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আটকে যাওয়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটতে পারে। অথচ এই অঞ্চলে জলবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত ক্রমেই বাড়ছে এবং দেশগুলোর বিদ্যুতের চাহিদার পারস্পরিক পরিপূরকতার কারণে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তাও দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।’
প্রতিবেদন সূত্র-