আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৬টা ৪০ এর দিকে শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে ৫ টার দিকে ধামরাই পৌর এলাকার কায়েতপাড়ায় মাধব মন্দিরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। পরে মাধব বিগ্রহ (মাধব মূর্তি) রথে নিয়ে স্থাপন করা হয়। এরপর রথখোলা মঞ্চে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-২০ ধামরাই আসনের সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ, ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ, ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান অভি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ মন্দির কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল জীবন কানাই দাস (অব:)। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত বণিক।
রথযাত্রা উৎসবকে ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান অতিথি নুরুল ইসলাম মনি তার বক্তব্যে বলেন, আমার খুব ভালো লেগেছে, আমার বুক ভরে গেছে মানুষে মানুষের সম্প্রীতি, আপনারা ধর্মে ধর্মের যে সম্প্রীতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো আজকের এই ধামরাই। আমি ধামরাই কথা শুনেছি আমাদের জিয়াউর রহমান আমাদের এর একজন মাননীয় সংসদ ছিলেন ব্যারিস্টার জিয়া, তার মুখে। বলছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রথ উৎসব হয় ধামরাইতে। আমার খুব ইচ্ছা ছিল একবার আসার। কিন্তু আমি যে প্রধান অতিথি হয়ে আসবো তা আমি কখনো ভাবিনি। আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি আপনাদের আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই যে আপনারা আমাকে দাওয়াত নিয়ে এসেছেন।
দেশের কোনো মানুষ সংখ্যালঘু নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান বলেছেন বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু নেই। আপনারা কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য না। এই দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন যুদ্ধ করেছি আপনারা আমরা সবাই। এই দেশের স্বাধীন করার জন্য আপনারা জীবন দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন। দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন আপনারা কি করে সংখ্যালঘু হন? স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমাদের নেতা তারেক সাহেব বলেছেন দেশের কোনো মানুষ সংখ্যালঘু নয়। আপনারা সংখ্যালঘু নয় সেটা স্থাপন করার জন্য তিনি নানান কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। সে কার্যক্রমের ব্যাখ্যা আমাদের নেতৃবৃন্দ দিবেন, আমিও দেব। কিন্তু আপনাদের একটা কথা বলি আমাদের হিন্দু অথবা অন্য ধর্মাবলম্বী ভাইদের জন্য এটাই সুযোগ, এটাই বক্তব্য এটাই যে আপনারা দেশের সংখ্যালঘু নন। আপনারা এই দেশের নাগরিক একজন নাগরিক মুসলমান হিসেবে যে অধিকার ভোগ করবে, একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যারা বলে আসবে, সকল মানুষের সেই একই অধিকার। একজন হিন্দুর যে অধিকার একজন মুসলমানের একই অধিকার, একজন খ্রিস্টান বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মের সকল মানুষের অধিকার এক। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারেক রহমান আজকে সরকারে বসছেন ক্ষমতায় বসছেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কোনো নেতা এই কথা বলেননি।
সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাধ মিলিয়ে দেশ গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান এ কথা বলে তিনি প্রমাণ করেছেন ধরুন আপনাদের একটা উদাহরণ দিয়ে, কোনো কোটা নাই কারো কোন কোটা নাই। কোটা হলো একটা যিনি মেধাবী তার জন্য। এই দেশ মেধাবীরা এই দেশ গঠন করবে। আপনারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাধে কাধ মিলিয়ে দেশ গঠন করবেন এটা তার প্রত্যাশা।
ইনিভার্সাল কার্ড দেওয়া হবে জানিয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, এ জন্য তিনি ডাক দিয়েছেন অনেক কিছু। বাংলাদেশের সরকার গঠন করার পর প্রথম বৈঠকের প্রথম সিদ্ধান্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকের কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ। এটা বাংলাদেশে তারেক রহমান করেছেন। তারেক রহমান গ্রামেগঞ্জে তার বাবার মত এসেছেন, গ্রামে যে মানুষের কষ্ট দেখেছেন, দুঃখ দেখেছেন, যন্ত্রণা দেখেছেন, সে যন্ত্রণা দেখে তিনি কৃষক কার্ড ফ্যামিলি কার্ড এবং মায়েদের বোনদের জন্য এবং শিক্ষা কার্ড তারপর প্রবাসী কার্ড হেলথ কার্ডসহ নানান জাতীয় সর্বশেষ তিনি বলেছেন সকল সুযোগ সুবিধা যে কার্ডের মধ্যে দেব আমরা একটা ইউনিভার্সাল কার্ড দিব গতকাল তিনি পার্লামেন্টে করেছেন। ইউনিভার্সাল কার্ড আপনারা কি করবেন? আপনার সন্তানের লেখাপড়া নিশ্চিত করবেন। আমার মায়েরা আমার বোনেরা যারা আছেন তারা যাতে ভালো জীবন যাপন করেন এবং সংসারের দায়িত্ব নিতে পারেন তার জন্য ২৫০০ টাকা পরিমাণ সম্পদ দিবেন যাতে আপনারা দুবেলা না খেয়ে না থাকতে হয় তার ব্যবস্থা তিনি করছেন।
দেশ জুড়ে খাল খনন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষ শিক্ষিত হোক। এদেশে মানুষ ভালো থাকুক এটাই তার স্বপ্ন। তার জন্য তিনি নানান জাতীয় কার্যক্রম করা শুরু করেছেন একটা কাজ করেছেন ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন। ২০ হাজার কিলোমিটার উনার আব্বা করেছিলেন। আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম একটা গণতন্ত্রের জন্য। আমরা ৭৫ সালে বাকশাল পেয়েছি। একদল কোন দলই থাকবে না। সেখান থেকে বেরিয়ে জিয়াউর রহমান তিন বছরের মাধ্যয় খাদ্যের স্বয়ংসম্পন্ন করেছেন।
ধামরাইয়ে খাল খননের পর বরাদ্দের বেঁচে যাওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মধ্যে এই ধামরাইতে দুইটা খাল খন করার কথা ছিল ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা দিয়ে। আপনাদের এমন এমপি পেয়েছেন ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার খাল খন করার পর এক কোটি ২০ লক্ষ টাকা সরকারের কাছে ফেরত দিয়েছেন, দরকার হবে না। খাল খনন হয়েছে। আপনার দেওয়ার জন্য সবাই মিলে আমরা আপনাকে অভিনন্দন জানাই। এরকম সৎ লোককে আপনারা নির্বাচিত করেছেন।
বিগত শাসনামলে ৩০ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এখানে দেখেছি হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে গত ১৬ বছরে ১৫ বছরে ৩০ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। হিসাব মত দেওয়ার পরিমাণ বলেছেন ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ৩৪২ বিলিয়ন ডলার, আর সেটা আমি বলি ৩০ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আজকে আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন, হাসিনার পরিবারে ৫৭ হাজার কোটি টাকা, আর তার স্বজন ল্যাসপেন্সার যারা ছিল সবগুলো ৭৪ হাজার কোটি টাকা।
বিগত সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মন্দির ভাঙা হতো মন্তব্য করে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ভেবে দেখেন, তারা কি করতো, তারা পূজার আগে বা বিভিন্ন সময় একটা মন্দিরে আগুন লাগিয়ে দিত, মন্দিরে মূর্তির হাত ভাঙতো, পা ভাঙতো। ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙতো। আচ্ছা আপনাদের প্রশ্ন যদি করি, গত দুই বছরে কয়টা মন্দিরে আক্রান্ত হয়েছে, এটা একটু বলুন তো? আমাদের সংখ্যালঘু ভাইদের বলি, একটা মন্দিরেও কোথাও কোনো আক্রমণ হয় নাই, কোনো অসুবিধা হয় নাই। এই ভাইরা মন্দির পাহারা দিয়েছেন। পাঁচ তারিখে পরে দেন নাই? এই যে মন্দির পাহাড়া দেয় নাই? আমার এলাকায় একটা কোনো দুর্ঘটনা ঘটে নাই। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে নাই। আমি বরগুনা সাগর পাড়ে ওখানে হিন্দুদের এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রাখাইন আছে হিন্দু আছে এবং অনেক বেশি অনেক বেশি। আলহামদুলিল্লাহ কোন সমস্যা হয় নাই। তারা ইচ্ছেকৃতভাবে সমস্যাটা তৈরি করে, হিন্দু মুসলিমদের একটা বিবেদন সৃষ্টি করার চেষ্টা এটাই ছিল তাদের রাজনীতি। সেই সুযোগে তারা রাজনীতি করার চেষ্টা করতো। কিন্তু তারেক রহমান বলেছে, হিন্দু মুসলমান এই দেশে নাগরিক। তার সকলের জন্য কৃষক কার্ড হিন্দুরা যেমন পাবে, মুসলমানরা তেমন পাবে। ফার্মার্স কার্ড, মানে ফ্যামিলি কার্ড হিন্দুরা যেমন পাবে মুসলমানরা তেমন পাবে। সংখ্যালঘু হিন্দুরা যেমন হবে মুসলমানরা তেমন হবে। এইযে শিক্ষিত এইযে সম্প্রদায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেমন হবে এবং মুসলমানরা সবাই মিলে আমরা এখানে শিক্ষিত হবে। আমরা দেশ গঠন করব।
অসাম্প্রদায়িক দেশ আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব, সেই ধারণা নিয়ে জুলাই চেতনা হয়েছে মন্তব্য করে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আমরা কাধে কাধ মিলিয়ে সবাই ঐক্যভাবে এই দেশটাকে আমরা গঠন করব। আমরা সেই ব্যাপারে সবাই ঐক্য হব। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং গণতন্ত্র ধারণ করি। জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে, সেই জুলাই মাসে এটা আজকে এটা হচ্ছে। আমরা জুলাই চেতনা ধারণ করি অন্তরে। যারা স্বাধীনতার চেতনা বিক্রি করেছে তারা পালিয়ে গেছে। আমি অনুরোধ করতে চাই জুলাই চেতনা কেউ বেইচেন না। জুলাই চেতনা ধারণ করেন। ধারণ করে জুলাই চেয়েছে কি? এই দেশে মানুষের অধিকার গণতন্ত্রের অধিকার,জুলাই যে দেশে মানুষ সবাই মিলে সমৃতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকবে এবং এটা কোন সাম্প্রদায়িক দেশ নয়। অসাম্প্রদায়িক দেশ আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব, সেই ধারণা নিয়ে জুলাই চেতনা হয়েছে। জুলাই সৃষ্টি হয়েছে আমরা সেই চেতনাকে ধারণ করব। আর সেই চেতনা ধারণ করতে গিয়া আমাদের নেতা জিয়াউর রহমান তার পুত্র তারেক রহমান সাহেব সমগ্র দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ২৫ কোটি গাছ লাগাবেন। কাজেই এই কল্যাণ কিসের জন্য? এই কল্যাণের জন্য আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে তার হাতকে শক্তিশালী করবো।
এ সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি আজকের এই অনুষ্ঠানে বিএনপির বক্তৃতা দিতে আসে নাই, আসছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলতে। কিন্তু বিএনপির একটা কথা দুই একটা কথা নয়। মানুষের গণতন্ত্র বিনির্মাণের জন্য তিনি চেষ্টা করেন, কিছু মানুষ আছে গতকালকে পার্লামেন্টের সমাপ্তি দিনে তিনি বলেছেন। বলেছেন কি যে এইখানে কোন উগ্রবাদ মাথা চাড়া দিতে পারবে না। এবং উগ্রবাদের টুটি চেপে ধরা হবে না শুধু, মূল উৎপাটন করা হবে, ঘোষণা করেছেন আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান। কাজে উগ্রবাদের নাম দিয়ে আমাদের পলাতক সরকার স্বৈরাচারী মাফিয়া সরকার দেখছেন, বহু মাদ্রাসার ছাত্র বহু মসজিদের মানুষ বহু মন্দিরের মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে নিয়া নিরীহ মানুষ নিষ্পাপ মানুষকে গুলি করে মেরে বলেছে এইখানে মৌলবাদ আবিষ্কার হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো জায়গায় মৌলবাদ গত দুই বছর দেখেছেন? কোনো মৌলবাদ নাই। বাংলাদেশ ভালো দেশ, সেটাকে একটা আখ্যা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। আমরা মৌলবাদে বিশ্বাস করি না, বিএনপি মৌলবাদে বিশ্বাস করে না। ধামরাইয়ের মানুষ মৌলবাদে বিশ্বাস করে না। আপনারা করেন? না। আমরা বিএনপি চাই, আমরা মৌলবাদ মুক্ত একটা সম্প্রীতির দেশ এবং সকলে মিশে এই দেশটা গঠন করব।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি পুরোহিতের হাতে প্রতীকী রশি প্রদান করেন। এর কিছু সময় পর ভক্তরা পাটের রশি ধরে টেনে শ্রী শ্রী যশোমাধবকে তার শ্বশুরালয় যাত্রাবাড়ী মন্দিরে নিয়ে যান। সেখানে নয় দিন অবস্থানের পর ২৪ জুলাই পুনরায় আবার বাড়ি আনা হবে উল্টো রথযাত্রা উৎসবের মধ্য দিয়ে। তবে মেলা চলবে এক মাস।