বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বগুড়া এনজিও ফোরাম মিলনায়তনে করতোয়া নদীর সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে আয়োজিত এক গণশুনানিতে এসব দাবি উঠে আসে। এতে নদীপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা, কৃষক, মৎস্যচাষী, পরিবেশবিদ, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
গণশুনানিতে করতোয়ার ভাটির এলাকা সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, দূষিত নদীর পানি দিয়ে সেচ দেওয়ায় ধানের ফলন কমে যাচ্ছে। নদীর মাছ ও ঝিনুক খেয়ে হাঁস মারা যাচ্ছে, গবাদিপশুর শরীরে ঘা হচ্ছে। এমনকি তার দেখা দুটি গরুও মারা গেছে।
একই গ্রামের দেলোয়ারা খাতুন জানান, দূষণের কারণে নদীতে হাঁস নামানো যায় না। ফলে হাঁস পালন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিকল্প পানির ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে দূষিত নদীর পানি ব্যবহার করছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাতের অন্ধকারে নদীতে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা হয়, যা স্থানীয়দের নজরের বাইরে থেকে যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর রাজশাহী-রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল বলেন, করতোয়া দূষণ বন্ধে একাধিক জনস্বার্থ মামলা করা হলেও আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি জানান, খুলসী পয়েন্ট থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার নদী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রয়োজন হলে জমি অধিগ্রহণ করে ওই অংশ পুনঃখননের দাবি জানান তিনি।
গণশুনানিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, করতোয়া পুনরুদ্ধারে সরকার কাজ করছে। তবে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে খুলসীর স্লুইস গেট অপসারণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আছাদুজ্জামান হক জানান, করতোয়া নদী পুনঃখননের জন্য প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন বলেন, বগুড়াকে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)-এর চেয়ারম্যান খুশী কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. সামসুদ্দীন ফিরোজ, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শারমিন আক্তার, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোছা. রিপা পারভীনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীদের অভিমত, করতোয়া শুধু একটি নদী নয়—এটি উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই নদী রক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা নয়, এখন প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ।