বিশ্ব বাণিজ্যনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে ৬০টি দেশের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ববর্তী 'পারস্পরিক' শুল্ক নীতি বাতিল করে দেওয়ার পর হোয়াইট হাউস থেকে এ সংক্রান্ত নতুন সিদ্ধান্ত এলো। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১২টা ০১ মিনিট (ইস্টার্ন ডেলাইটস টাইম বা ইডিটি) থেকেই এই নতুন শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে পূর্বে আরোপিত ১৫০ দিনের অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই নতুন এই নিয়ম বলবৎ হবে। তবে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে নির্দিষ্ট কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৮শে জুলাই রাত ১২টা ০১ মিনিটের আগে যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহের উদ্দেশ্যে পরিবহনাধীন রয়েছে, সেগুলোকে নতুন এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় এই শুল্ক ধার্য করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মূলত বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) থেকে জবরদস্তিমূলক বা জোরপূর্বক শ্রম নির্মূল করার লক্ষ্যে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে চলা দাবির প্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের রাজনৈতিক নেতারাই বৈশ্বিক বাণিজ্যে শ্রমশোষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা ইতোমধ্যে নিজ দেশে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের ওপর কঠোর আমদানি নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে আসছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো জবরদস্তিমূলক শ্রম রোধে ঢিলেঢালা নীতি অনুসরণ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ব্যবসায়ীরা একপ্রকার অন্যায্য প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। দেশীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা এবং বৈশ্বিক বাজারে সমতা ফেরাতে নতুন নিয়মে দুই ধরনের শুল্ক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব দেশে জবরদস্তিমূলক শ্রম রোধে পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ হারে শুল্ক বসবে (যেমন ভারতের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে)। আর যেসব দেশে এ সংক্রান্ত নিয়মকানুন অপর্যাপ্ত বা দুর্বল, সেসব দেশের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১২.৫ শতাংশ।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে সব পণ্যে এই অতিরিক্ত শুল্ক প্রযোজ্য হবে না। তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, রাসায়নিক সার এবং নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্যকে নতুন শুল্কের আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। এছাড়া যেসব পণ্যে ইতোমধ্যেই জাতীয় নিরাপত্তা শুল্ক আরোপিত রয়েছে—যেমন অটোমোবাইল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা—সেগুলোতে নতুন করে কোনো অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না।
অন্যদিকে, 'যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা' (ইউএসএমসিএ) বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্ভুক্ত পণ্যগুলোকেও এই শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। উত্তর আমেরিকার সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল এবং এসব পণ্যে মার্কিন উপাদানের উচ্চ উপস্থিতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাণিজ্যিক সুরক্ষার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর নীতি বজায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইবোলা ভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি হোয়াইট হাউস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের বাণিজ্যিক লক্ষ্য অর্জনে আইনসম্মত শুল্কসহ সম্ভাব্য সকল আইনি ও প্রশাসনিক উপায় ব্যবহার করতে প্রশাসন বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।