আছিয়ার বিচার থমকে আছে হাইকোর্টের আপিলের টেবিলে। অন্যদিকে, দেশের মানচিত্রজুড়ে গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক শিশুর নিথর দেহ মিলছে। সিরাজদিখান, রানীশংকৈল, রাজশাহী থেকে রাজধানীর পল্লবী—সর্বত্রই যেন এক পৈশাচিক উৎসব চলছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দ্রুত বিচারের বিধান থাকলেও, উচ্চ আদালতে গিয়ে তা অদৃশ্য এক দেয়ালে ধাক্কা খায়। আছিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড নিম্ন আদালতে এক বছর আগেই হয়েছে। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে ‘ডেথ রেফারেন্স’ ও ‘আপিল’ শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত রায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। মামলার জটে উচ্চ আদালতে একটি শুনানি শুরু হতেই বছরের পর বছর কেটে যায়। অপরাধী যখন কারাগারে রাষ্ট্রীয় অন্নে পুষ্ট হয়, ভুক্তভোগী পরিবার তখন আদালতের বারান্দায় ঘাম ঝরায়। এই বৈষম্যই অপরাধীদের মনে বার্তা দিচ্ছে, অপরাধ করলেও ‘পার পাওয়া সম্ভব’।
গত কয়েকমাসের সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে দেখা যায়, শিশুরা আজ কতটা অরক্ষিত। পল্লবীতে সাত বছরের রাইসাকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা চালিয়েছে খুনি সোহেল রানা। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে মেরেছে তার নিজের সৎমামা। সম্পর্কের যে বিশ্বাসটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও যেন আজ মৃত। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল বা রাজশাহীর দুর্গাপুরে ভুট্টাক্ষেত কিংবা খেজুর গাছের নিচে যখন ৪ বছরের লামিয়া বা জান্নাতের নিথর দেহ পড়ে থাকে, তখন তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার ‘গালে’ এক চপেটাঘাত হয়েই বাজে।
দুর্গাপুরে জান্নাতের মরদেহ নিয়ে হাজারো মানুষের কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে সড়ক অবরোধ প্রমাণ করে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পুলিশ ও প্রশাসনের ‘তদন্ত চলছে’ কিংবা ‘মামলা প্রক্রিয়াধীন’; এই চেনা বুলি এখন আর কাউকে আশ্বস্ত করতে পারছে না।
ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন অপরিবর্তিতই থাকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না এ ধরনের পৈশাচিক ঘটনার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তিন মাসের মধ্যে কার্যকর হবে, ততক্ষণ অপরাধীরা ভয় পাবে না। আছিয়ার পরিবারকে একটি সংগঠন থেকে একটি গাভি দেয়া হয়েছে; যার দুধ বেচে কোনোমতে সংসার চলে। মা আয়েশা খাতুনের আক্ষেপ, ‘সরকারের অনেক চাল-ডাল আছে, খুনি হিটু শেখকে খাওয়াচ্ছে। আর আমাদের পেটে ভাত জোটে না।’
বিচারের এমন দীর্ঘসূত্রতা আসলে ‘খুনিদের পুনর্বাসন’ করারই নামান্তর। দেশের মানুষ এখন কেবল আদালতের রায় চায় না, চায় তার দ্রুত বাস্তবায়ন। একটি শিশু যখন ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরে যায়, তখন সেই রক্তের দাগ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভেই লেগে থাকে। আজ আছিয়া, কাল রাইসা, পরশু হয়তো আপনার পাশের বাসার কেউ। এখনই বিশেষ বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের বর্বরতা কঠোরভাবে দমন করা না গেলে রাষ্ট্রের পক্ষে নিজেকে ‘মানবিক’ দাবি করা কঠিন হয়ে পড়বে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ব্যর্থতাকে ক্ষমা করবে না।