ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাইয়ে বাদ পড়া নামের সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী দলগুলো ও তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। শনিবার রাজধানী দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভেরও ঘোষণা দিয়েছে তারা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিজেপি জানিয়েছে, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটারের, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র স্থানান্তরিত, ১ কোটি দ্বৈত নিবন্ধিত এবং প্রায় ৩ কোটি ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাররা অসমানুপাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কারণে সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের ফলও প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লিতে বিক্ষোভের ঘোষণা
সিজেপি, তরুণ আন্দোলনের সমর্থক, কৃষক সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছে। তাদের অন্যতম দাবি, নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। পুলিশ জানিয়েছে, সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিজেপির দাবি, বিক্ষোভের কয়েকজন নেতাকে আগাম আটক করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভোটার তালিকা যাচাই কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের দুই সহকর্মী ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কুমারের কাছে একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এসব উদ্বেগ তোলা হলেও সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলেছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতভিন্নতা স্বাভাবিক এবং তাদের সব সিদ্ধান্ত আইনসম্মত। কমিশন কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, বিজেপির অভিযোগ, বিরোধীরা বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। দলটির বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের নির্বাচনী সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সামনে একাধিক রাজ্যের নির্বাচন
আগামী বছরের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী বছর অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকা যাচাই কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশ, যা ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া উত্তর প্রদেশের ভোটার তালিকা যাচাইয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় তালিকাভুক্ত হতে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতে হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগও তুলেছেন অনেকে।
বিরোধী দল কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং এর ফলে বিজেপি নির্বাচনী সুবিধা পেতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি উভয়েই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে কী হবে?
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনও ভোটার মারা গেলে, একাধিকবার নিবন্ধিত থাকলে, অন্য এলাকায় চলে গেলে অথবা যাচাইয়ের সময় তাঁকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হতে পারে। কর্মকর্তাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে নাম বাদ দেওয়ার কারণ নথিভুক্ত করার কথা।
খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করা যায়। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগও রয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরাও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন অথবা নতুন করে নিবন্ধনের আবেদন করতে পারেন।
তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, জটিল ও দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়ার কারণে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধার মুখে পড়তে পারেন। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে জ্ঞানেশ কুমার বিরোধীদের অভিযোগ হলফনামার মাধ্যমে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ভোটার তালিকা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য প্রকৃত ভোটারদের তথ্য হালনাগাদ রাখা হলেও, এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনায় প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও ভোটাধিকার সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। সামনে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন থাকায় এই বিতর্ক ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা ও রাজনৈতিক পরিবেশে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।