বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, তাদের বানানো কাহিনী দেওয়া হচ্ছে বলার জন্য এবং সাজানো প্রমাণ জোগাড়ের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সমর্থনপত্র, ছবি ও চিকিৎসা প্রতিবেদন।
এরপর তারা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ফিরলে প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে- এই যুক্তিতে সমকামী হিসাবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে আশ্রয়ের আবেদন করছেন।
বিবিসির এই অনুসন্ধানের জবাবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, যারা এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা হবে। যার মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে অপসারণের মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থায় তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, যারা নিজ দেশে ফিরে গেলে ঝুঁকিতে পড়বেন— যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সমকামিতা অবৈধ।
তবে বিবিসি নিউজের তদন্তে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে থাকতে চাওয়া অভিবাসীদের কাছ থেকে ফি আদায় করে আইন উপদেষ্টারা পদ্ধতিগতভাবে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করছেন।
এদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, কর্মজীবী বা পর্যটক ভিসায় যুক্তরাজ্যে ছিলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। তারা ছোট নৌকায় বা অন্য অবৈধ পথে সদ্য আসা লোকজন নন। এখন এই গোষ্ঠীই সব আশ্রয় আবেদনের ৩৫ শতাংশ, ২০২৫ সালে যার সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।
বিবিসির তদন্তে যা জানা গেছে—
• একটি আইন সংস্থা ভুয়া আশ্রয় আবেদন বানাতে সর্বোচ্চ সাত হাজার পাউন্ড দাবি করেছে। তারা বলেছে, এর ফলে স্বরাষ্ট্র দপ্তরে প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা ‘খুবই কম।’
• ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা বিষণ্নতায় অসুস্থ থাকার ভান করে চিকিৎসকদের কাছে গেছেন, যাতে মামলা জোরদার করতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। এমনকি একজন নিজেকে এইচআইভি পজিটিভ বলেও মিথ্যা বলেছেন।
• এক ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা গর্ব করে বলেছেন, তিনি ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে ভুয়া দাবি তৈরি করতে সাহায্য করছেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, গ্রাহকের সঙ্গে সমকামী যৌন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন—এমন সাজানো কাউকে তিনি জোগাড় করেও দিতে পারেন।
• বিবিসির আন্ডারকভার প্রতিবেদককে এমনও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার পর তিনি পাকিস্তান থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারবেন এবং পরে স্ত্রীকে লেসবিয়ান সাজিয়ে ভুয়া দাবি করা যাবে।
• আরেক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক আইনজীবী বলেন, তিনি সমকামী বা নাস্তিক সেজে সফলভাবে আশ্রয় পেতে মানুষকে সহায়তা করেছেন। তিনি ১৫০০ পাউন্ড ফিতে ভুয়া দাবি করতে সাহায্যের প্রস্তাব দেন এবং প্রমাণ বানাতে আরও দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড লাগবে বলে জানান।
‘এখানে কেউই সমকামী নয়’
পূর্ব লন্ডনের বেকটনের এক শান্ত এলাকায় অবস্থিত একটি কমিউনিটি সেন্টারে একটি অনুষ্ঠানে ১৭৫ জনের বেশি মানুষ জড়ো হন।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাউথ ওয়েলস, বার্মিংহাম ও অক্সফোর্ডের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকেও এসেছেন, উরচেস্টার এলজিবিটি আয়োজিত একটি সভায় অংশ নিতে। সংগঠনটি নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি সহায়তাগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দেয়।
এই গ্রুপের ওয়েবসাইটে বলা হয়, শুধুমাত্র প্রকৃত সমকামী আশ্রয়প্রার্থীরাই স্বাগত। কিন্তু বিবিসির আন্ডারকভার প্রতিবেদকের কাছে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পুরুষরা সহজেই স্বীকার করেন—বাস্তবতা ভিন্ন।
‘এখানে বেশিরভাগই সমকামী নয়,’ বলেন ফাহার নামে একজন। নিজেকে জিশান নামে পরিচয় দেওয়া আরেকজন বলেন, ‘এখানে কেউই সমকামী নয়। এক শতাংশও না। ০.০১ শতাংশও না।’
বিবিসির প্রতিবেদকের এই সভায় যাওয়ার শুরুটা হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে—বার্মিংহাম ও লন্ডনভিত্তিক ইমিগ্রেশন আইন সংস্থা ল অ্যান্ড জাস্টিস সলিসিটরস-এর প্যারালিগ্যাল মাজেদুল হাসান শাকিলের কাছে যাওয়ার মাধ্যমে।
আইনি কাজের পাশাপাশি শাকিল উরচেস্টার এলজিবিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিনি কমিউনিটি গোষ্ঠীর ওয়েবসাইটে নিজের আইনি সেবার প্রচার করতেন।
একটি সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে শাকিল বলেন, আশ্রয় চাইতে হলে নির্যাতনের আশঙ্কা থাকতে হবে এবং বিবিসির প্রতিবেদকের সে ধরনের ভিত্তি আছে বলে মনে হয়নি।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, অপ্রত্যাশিতভাবে, নিজেকে তানিসা বলে পরিচয় দেওয়া একজন ফোন করেন।এরপর তার সাথে উর্দুতে কথাবার্তা হয়। তিনি অনেক বেশি আগ্রহ দেখান—সমকামী পরিচয়ের ভিত্তিতে কীভাবে আশ্রয়ের আবেদন করা যায়, তা ব্যাখ্যা করেন।
প্রতিবেদক যখন বলেন, তিনি সমকামী নন, তানিসা বলেন, আমার কথা শোনো। এখানে কেউই আসল নয়। এখন এখানে বাঁচার একটাই পথ এবং সেটাই সবাই নিচ্ছে।
কে তার নম্বর দিয়েছে-এ প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও, হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল ছবি ও প্রথম নাম মিলিয়ে বিবিসি নিশ্চিত হয়েছে যে তিনি উরচেস্টার এলজিবিটির উপদেষ্টা তানিসা খান।
এরপর বিবিসির এই প্রতিবেদক তানিসার সঙ্গে প্রাথমিক পরামর্শের জন্য পূর্ব লন্ডনের ফরেস্ট গেটে যান। প্রথম বৈঠকটি কোনো আইনি পরামর্শক সংস্থার দপ্তরে নয়, বরং অনুষ্ঠিত হয় তার নিজের বাড়িতে।
‘এই মুহূর্তে ভিসা পাওয়ার একটাই পথ খোলা—আশ্রয় ভিসা… মানবাধিকারভিত্তিক, যাকে বলা হয় গে কেস বা একই লিঙ্গ,’ তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো ভিসার আশা নেই’।
তিনি জানান, হোম অফিসের সাক্ষাৎকারের জন্য বানানো গল্প মুখস্থ করতে হবে। পরীক্ষা দিতে তোমাকেই যেতে হবে… আমি সব প্রস্তুত করে দেব।
৪৫ মিনিটের এই আলোচনায় বোঝা যায় যে ভুয়া আশ্রয় দাবির প্রতারণা কতটা জটিল হতে পারে, আর তাই তা শনাক্ত করা কর্মকর্তাদের জন্য কতটা কঠিন।
কেউ সমকামী কি না, তা যাচাইয়ের কোনো পরীক্ষা নেই, বলেন তানিসা। মূল বিষয় হলো—তুমি কী বলছো। বলতে হবে, আমি সমকামী, এটাই আমার বাস্তবতা। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ছবি, ক্লাবের টিকিট, সমর্থনপত্র— সব মিলিয়ে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ’ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি আপনাকে একজনের কাছ থেকে একটি চিঠি দেব, যার সাথে আমরা কয়েকটি ছবি তুলব এবং সেই ব্যক্তি লিখবে যে সে আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে।
তানিশার এই সেবার দাম আড়াই হাজার পাউন্ড। আর আবেদন নাকচ হলে আপিলে গেলে খরচ আরও বাড়বে। সফল হলে কাজ, বসবাস, ভাতা সবই মিলবে, তিনি বলেন। প্রতিবেদক স্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন করলে তানিসা বলেন, ওকে এখানে আনলে, ওরও আশ্রয় করব… ওকে লেসবিয়ান বানাব।
একই সময়ে বিবিসির আন্ডারকভার প্রতিবেদক লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে থাকা কননাউট ল’এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আকিল আব্বাসির সঙ্গেও দেখা করেন।
আব্বাস পরামর্শ দেন যে, তিনি ওই প্রতিবেদককে এই দেশে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। এজন্য তিনি ভুয়া দাবির সপক্ষে কাগজপত্র তৈরির পরামর্শ দেন।
আব্বাসি সহায়তার জন্য সাত হাজার পাউন্ড ফি দাবি করেন এবং বলেন যে প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা ‘খুব কম।’
অর্থ দেওয়ার পর কীভাবে এবং কী ধরনের প্রমাণপত্র যোগাড় করতে হবে, তার পরামর্শ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। সেজন্য কোথায় যেতে হবে বা কী করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হবে। তাদের সোসাইটি ও ক্লাব থেকে অবশ্যই প্রমাণ জমা দিতে হবে'।
বিবিসির সংবাদদাতা জানতে চান যে, এরকম একটি সমকামী ক্লাবে তাকে যেতে হবে কি না।
-অবশ্যই, তোমাকে যেতে হবে।
-কিন্তু আমি তো সমকামী নই।
আব্বাসি এই কথায় কিছুটা মজা পেয়েছেন বলে মনে হয়। তিনি বলেন, আমি সেখান থেকে কিছু ছবি তুলে নেবো।
এই আইন উপদেষ্টা পরামর্শ দেন, এমন কাউকে খুঁজে বের করা, যিনি তার পুরুষ সঙ্গী হিসেবে পরিচয় দেবেন।
যখন রিপোর্টার বলেন যে, পাকিস্তানে তার স্ত্রী রয়েছে, আব্বাসি তখন দ্রুত একটি সমাধান বাতলে দেন। তিনি বলেন, এর ব্যাখ্যা হবে পাকিস্তানের তুলনায় যুক্তরাজ্যে অনেক বেশি উদার, ফলে তিনি একজন পুরুষ সঙ্গী নিতে পেরেছেন।
‘আপনার জন্য আমরা একটি বিবৃতি তৈরি করে দেবো। যখন সেটা আপনি একবার পাঠ করবেন, তখন আপনি বুঝবেন সেটা কেমন।’
সমকামী সেজে থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের দ্বারা ব্যবহৃত কমিউনিটি গোষ্ঠীর মধ্যে উরচেস্টার এলজিবিটিই একমাত্র নয়। লুটনভিত্তিক মুসলিম এলজিবিটি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা এজেল খান বলেন, অনেকেই আমার সংগঠনের পক্ষ থেকে সুপারিশপত্র দেওয়ার জন্য আমাকে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আমি কখনোই তা নিই না। আমার সব কাজ স্বেচ্ছাসেবামূলক। কেউ কেউ এমনও বলেছেন, আমি সমকামী নই, কিন্তু আমি এই দেশে থাকতে চাই।
কতটি আশ্রয় আবেদন ভুয়া হতে পারে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা কঠিন।
তবে হোম অফিসের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে করা আশ্রয় দাবির ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নাগরিকদের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পরিসংখ্যানবিদরা লক্ষ্য করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকদের কাছ থেকে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে দ্রুত বেড়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী বা কাজের ভিসায় থাকা বাংলাদেশ ও ভারতের অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা।