রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

সারা দেশ

রাক্ষুসী যমুনার ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি-বসতভিটা

রাক্ষুসী যমুনার ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি-বসতভিটা

একদিকে বাড়ছে যমুনার পানি, অন্যদিকে নদী যেন ক্রমেই হয়ে উঠছে রাক্ষুসী। পানির স্রোতে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন চর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। গত তিন মাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শত শত বিঘা ফসলি জমি, বসতভিটা, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার ও অসংখ্য গাছপালা। সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন প্রায় এক হাজার পরিবার।

ঘর হারিয়ে কেউ আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের জমিতে, কেউবা পলিথিন টানিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘর ঘিরে বসবাস করছে পরিবার। সরকারি উদ্যোগে চাল ও শুকনো খাবার দেওয়া হলেও ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ না থাকায় হতাশা বাড়ছে নদীপাড়ের মানুষের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে শুধু বসতভিটাই নয়, কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিন মাসে বিলীন শত শত ঘর, ২ হাজার বিঘা জমি
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসী ও বারপাখিয়া এলাকায় গত তিন মাস ধরে যমুনার তীব্র ভাঙন চলছে। একইভাবে গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও হাতকোড়া গ্রামেও নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

এর মধ্যে সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসী ও ধীতপুর গ্রামেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দুই শতাধিক বাড়িঘর। স্থানীয়দের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার বিঘা আবাদি জমি, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ-মাদ্রাসা, একটি অফিসঘর এবং অসংখ্য গাছপালা নদীতে বিলীন হয়েছে।

এছাড়া ধীতপুর-কুরসী গরুর হাট ও বাজারও যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল, গবাদিপশু ও অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনাবেচায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। এতে কর্মসংস্থান ও আয় কমে গিয়ে চরম অর্থকষ্টে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

পলিথিনের নিচে জীবন, জাল দিয়ে ঘেরা ঘর
ধীতপুর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা আন্না খাতুনের জীবন যেন যমুনার ভাঙনের নির্মমতার প্রতিচ্ছবি। এক শিশু কন্যাকে নিয়ে গত এক বছর ধরে তিনি বাবা-মায়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আছেন।

কিন্তু সেখানেও রেহাই মেলেনি নদীর ভাঙন থেকে। যমুনার ভাঙনের মুখে বাবার বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন সেই শূন্য ভিটায় একটি পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ ঘরে মা রেহানা খাতুন ও শিশু সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে আন্নার।

ঘরটির এক পাশে কোনো বেড়া নেই। কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাছ ধরার জাল দিয়ে সেটি ঘিরে রাখা হয়েছে। অন্য পাশের পাটকাঠির বেড়া পচে খসে পড়ছে। নুইয়ে পড়েছে ঘরের চালও।

তারপরও যাওয়ার জায়গা নেই বলে ওই জীর্ণ ঘরেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। আন্না খাতুন বলেন, সরকারি সহায়তা হিসেবে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন। সেই চাল দিয়েই কোনো রকমে দিন পার করছেন। তবে কয়েক দিন ধরে তাদের খোঁজ নিতে কেউ আসেনি।

কুরসী গ্রামের কৃষক ইয়াসিন মোল্লার ছিল আট বিঘা জমি। সেই জমিতে ভুট্টা, ধান, সরিষা, বেগুন, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি চাষ করে স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতেন তিনি।

কিন্তু যমুনার ভাঙনে সেই জমি এখন নদীর বুকে।

ইয়াসিন মোল্লা বলেন, “যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে আমার ৮ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে বিভিন্ন ফসল ও সবজি চাষ করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”

ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন বলেন, নদীর ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে শূন্য ভিটায় খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে বসবাস করছেন। বৃষ্টি হলে ঘরের সবকিছু ভিজে যায়।

শামছুল হক বলেন, নদীতে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় পাশের শ্রীপুর গ্রামে অন্যের জমিতে বছরে ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মন্ডল বলেন, ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত বালুভর্তি জিওটিউবের বস্তা ফেলা প্রয়োজন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড চরবাসীর দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে এখনো বালুর বস্তা ফেলার উদ্যোগ নেয়নি।

সম্প্রতি ভাঙনকবলিত কুরসী বাজার এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভও করেছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সামনে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যাবে। এতে আরও হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু শাহজাদপুর নয়, জেলার চৌহালী উপজেলার চরসলিমাবাদ এবং কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া ও চরগিরিশ এলাকাতেও যমুনার ভাঙন চলছে। এসব এলাকায় প্রতিদিনই ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

নদীভাঙনে গাছপালা উপড়ে পড়ায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে চরাঞ্চলের কৃষি, যোগাযোগ ও জনবসতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চরাঞ্চলের ভাঙন প্রতিরোধে বর্তমানে কোথাও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারি কোনো প্রকল্প বা বরাদ্দ নেই। তবে চরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকলে সেগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড মূলত নদীর তীর রক্ষায় কাজ করে। নদীর ডান বা বাম তীরে সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

তবে নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্ন—ঘর, জমি, স্কুল, মসজিদ আর জীবিকা একের পর এক যমুনায় বিলীন হওয়ার পরও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে?

আরও

ফরিদপুরে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা, যানজট ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব

সারা দেশ

ফরিদপুরে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা, যানজট ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব

ফরিদপুরে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মা...

২০২৬-০৯-১৩ ১৮:০৯

লালমনিরহাটে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন

সারা দেশ

লালমনিরহাটে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন

আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জে...

২০২৬-০৯-১৩ ১৭:১৫

মেহেরপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে ২৪ মাসের শিশুর মৃত্যু

সারা দেশ

মেহেরপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে ২৪ মাসের শিশুর মৃত্যু

মেহেরপুরের গাংনীতে পুকুরের পানিতে ডুবে আরিশা খাতুন (২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজে...

২০২৬-০৯-১৩ ১৭:১৩

চুয়াডাঙ্গায় রাস্তা পারাপারের সময় দ্রুতগতির পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল বৃদ্ধার, চালক আটক

সারা দেশ

চুয়াডাঙ্গায় রাস্তা পারাপারের সময় দ্রুতগতির পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল বৃদ্ধার, চালক আটক

চুয়াডাঙ্গা সদরের আলুকদিয়ায় রাস্তা পারাপারের সময় পিকআপ ভ্যানের ধাক্কায় মোছা. হাওয়া বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু...

২০২৬-০৯-১৩ ১৭:০৮

গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিট চালু, ফের বাড়ল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ

সারা দেশ

গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিট চালু, ফের বাড়ল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় ইউনিটটি ফ...

২০২৬-০৯-১৩ ১৬:৩৭

সরকারি জমি দখলের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে: ডিএসসিসি প্রশাসক

সারা দেশ

সরকারি জমি দখলের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে: ডিএসসিসি প্রশাসক

অতীতে এলাকার উন্নয়ন, বিশেষ করে রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য সাধারণ মানুষ নিজেদের জায়গা-জমি ছেড়ে দিলেও বর্তমানে সরকারি জমি দখ...

২০২৬-০৯-১৩ ১৬:০৬