বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মহিপুর কলোনি এখন যেন এক আবেগঘন উৎসবের নাম। প্রায় ৪০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের ফিরে আসা ঘিরে সেখানে ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও উৎসুক জনতা। যেন বাস্তবের মাটিতে লেখা এক সিনেমার গল্প।
আঞ্জুমানারা, মৃত আবসার আলীর মেয়ে। দারিদ্র্যের তাড়নায় ছোটবেলায় এক প্রতিবেশীর সঙ্গে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন তিনি। একসময় অভিমান আর কষ্টে সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন অজানা পথে—যেখানে সামনে ছিল শুধু অনিশ্চয়তা।
জীবনের সেই কঠিন সময়ে এক সহৃদয় নারীর সহায়তায় আশ্রয় পান একটি এতিমখানায়। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন সংগ্রাম। পরবর্তীতে জীবিকার তাগিদে যোগ দেন গার্মেন্টস কারখানায়—যেখানে জীবন ধীরে ধীরে নতুন ছন্দ পেতে শুরু করে।
এই কর্মজীবনেই পরিচয় হয় শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। এক দুর্ঘটনায় আহত সাইফুলকে সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলেন আঞ্জুমানারা। সেই যত্ন থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসা, যা পরিণতি পায় দাম্পত্য জীবনে।
বিয়ের পর দুজনেই কিছুদিন চাকরি করে শ্রীমঙ্গলে সংসার শুরু করেন। পরে সংসারের দায়িত্ব নিতে স্বামী বিদেশে পাড়ি জমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার বড় হয়—এক মেয়ে ও তিন ছেলের জননী হন আঞ্জুমানারা। আজ তিনি নাতির মুখও দেখেছেন। তবুও জীবনের সব প্রাপ্তির মাঝেও কোথাও যেন অপূর্ণতা ছিল—নিজের শেকড়ে ফেরার আকুতি।
প্রায় ৩০ বছর আগে সেই খোঁজে বের হলেও নামের বিভ্রাটে ভুল করে পৌঁছে যান শেরপুর জেলায়। ভুল ঠিকানার এই বিভ্রান্তি তাকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন করে রাখে নিজের জন্মভিটা থেকে।
অবশেষে আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ফেসবুকের মাধ্যমে খুঁজে পান বগুড়ার প্রকৃত ঠিকানা—মহিপুর কলোনি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর আর দেরি করেননি। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ছুটে আসেন নাড়ির টানে।
দীর্ঘদিন পর বাড়ির মাটিতে পা রেখেই আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি। বাড়ির প্রতিটি কোণ, আত্মীয়দের নাম—সবকিছু যেন তার স্মৃতিতে অমলিন ছিল। তার মুখে সেই স্মৃতিচারণ শুনে নিশ্চিত হন স্বজনরা—এই তাদের হারিয়ে যাওয়া আপনজন।
এরপর শুরু হয় কান্না আর আলিঙ্গনের এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ ভিড় করেন এই বিরল মিলনমেলা দেখতে। বড় বোন আলোয়া খাতুন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা অনেক খুঁজেছি, পাইনি। একসময় ভেবেছিলাম আর বেঁচে নেই। আজ তাকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।”
আঞ্জুমানারা নিজেও বলেন, “এই ৪০ বছরে আত্মীয়দের ভালোবাসা পাইনি। আজ নিজের বাড়িতে ফিরে মনে হচ্ছে বুকের পাথর নেমে গেছে। তবে কষ্ট একটাই—অনেক প্রিয় মানুষকে আর দেখতে পারলাম না।”
হারিয়ে যাওয়া এক নারীর ফিরে আসার এই গল্প এখন শেরপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের মতে, সময় যতই পেরিয়ে যাক, শেকড়ের টান কখনও মুছে যায় না—আঞ্জুমানারা তারই জীবন্ত প্রমাণ।