গতকাল প্রচারিত ১৮ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারকে ঘিরে লর্ডস টেস্টের বাইরেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কারণ সাক্ষাৎকারটি প্রচার বন্ধ করতে স্কাই স্পোর্টসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। এমনকি ক্রিকইনফোর সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, সাক্ষাৎকার প্রচার হলে লাঞ্চের পর পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা মাঠে নামবেন না- এমন কথাও জানানো হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়েছে এবং পাকিস্তান দলও নির্ধারিত সময়েই মাঠে নেমেছে। ক্রিকেট চলেছে, তবে ক্রিকেটের আড়ালে থাকা রাজনৈতিক টানাপোড়েনও প্রকাশ্যে এসেছে।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও স্কাই স্পোর্টসের ব্রডকাস্টার মাইকেল আথারটন। এর কয়েক দিন আগেই ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে পাকিস্তান সরকারকে লেখা ২১ সাবেক অধিনায়কের একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি। ফলে লর্ডসে নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি নিছক পারিবারিক কথোপকথনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইমরানের বন্দিত্ব নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক বিতর্ক।
বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুই ছেলের উদ্বেগ
সুলাইমান ও কাসিমের বক্তব্যে উঠে এসেছে তাদের বাবার বর্তমান জীবন নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা। তাদের দাবি, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তারা ইমরানের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেননি। সর্বশেষ গত মার্চে তার সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও জানান তারা।
তাদের আরও দাবি, ইমরানের এক চোখের দৃষ্টিশক্তি ৮০ শতাংশ কমে গেছে এবং তাকে প্রতিদিন প্রায় ২৩ ঘণ্টা ছোট একটি কক্ষে একা থাকতে হচ্ছে। সুলাইমানের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় একাকী বন্দিত্বের কারণে ইমরানের রক্তচাপও বেড়ে যাচ্ছে।
কাসিম আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, ইমরানকে কার্যত হত্যা করার চেষ্টা চলছে এবং তাকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন করে তার কণ্ঠ রুদ্ধ রাখাই যেন উদ্দেশ্য।
তবে এসব অভিযোগ ইমরানের দুই ছেলের বক্তব্য। পাকিস্তান সরকার দীর্ঘদিন ধরে ইমরানের চিকিৎসা ও বন্দিত্ব নিয়ে বিরোধীদের বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চিকিৎসা নিয়েও পরিবারের ক্ষোভ
ইমরানের পরিবার ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের টানাপোড়েন নতুন নয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে আদিয়ালা কারাগারে বন্দী রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মামলায় তিনি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তবে ইমরান ও তার দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইমরানের ছেলেদের দাবি, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল এবং অন্তত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে রাখার কথা ছিল।
তবে তাদের অভিযোগ, ইমরানকে ওই হাসপাতালে না নিয়ে সরকারি পিআইএমএস হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। চিকিৎসা নিয়ে এই ঘটনাই পরিবারের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে বলে দাবি তাদের।
ক্রিকেট ও রাজনীতির সীমানায় ইমরান
লর্ডসের ঘটনায় ক্রিকেটের বাইরের একটি বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে—একজন দেশের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটারের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকট যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সম্প্রচারের অংশ হয়ে ওঠে, তখন ক্রিকেট বোর্ডের ভূমিকা কোথায় শেষ হয়?
পিসিবির অস্বস্তির কারণও সম্ভবত এখানেই। ইমরান শুধু পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ৮৮ টেস্ট ও ১৭৫ ওয়ানডে খেলা এই অলরাউন্ডারকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার নেতৃত্বেই ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছিল পাকিস্তান।
সেই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কই এখন ক্রিকেট মাঠের বাইরে রাজনৈতিক বন্দিত্বের প্রতীক। আর তার দুই ছেলে সেই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরলেন লর্ডসের মতো ক্রিকেটের ঐতিহাসিক এক মঞ্চের সম্প্রচারে।
শেষ পর্যন্ত পিসিবির আশঙ্কা সত্যি হয়নি। পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা মাঠে নেমেছেন, টেস্টও যথারীতি চলেছে। কিন্তু ১৮ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকার যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, সেগুলোর উত্তর কোনো স্কোরকার্ডে পাওয়া যাবে না।
লর্ডসে পাকিস্তান তখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রিকেটীয় লড়াইয়ে ব্যস্ত। আর মাঠের বাইরে পাকিস্তানের ক্রিকেট যেন মুখোমুখি হয়েছিল নিজের রাজনীতির সঙ্গে।