বিশ্লেষকদের মতে, এআইয়ের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামরিক ব্যবহার ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতা এখন প্রযুক্তি খাতের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যাবে?
সম্প্রতি এক প্রবন্ধে ডারিও আমোদেই সতর্ক করেন, এআইয়ের সক্ষমতা এত দ্রুত বাড়ছে যে আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এটি পুরো ইন্টারনেট দখল করে বিপুল ক্ষতি সাধন করতে পারে। সরকার ও গবেষকদের ঝুঁকি মোকাবিলার সময় দিতে ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলের উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান তিনি। তার এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক।
তবে ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এআইয়ে চীনের চেয়ে এগিয়ে এবং এই নেতৃত্ব ধরে রাখতে হবে। এআই প্রতিযোগিতায় যে দেশ জয়ী হবে, শেষ পর্যন্ত তারাই এগিয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, আমোদেইয়ের সতর্কবার্তার সঙ্গে ছিল চীনকে ঘিরে কড়া অবস্থানের প্রস্তাব। চীনের কাছে উন্নত এআই চিপ ও চিপ তৈরির সরঞ্জাম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মার্কিন এআই মডেল অনুকরণ ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, এআই প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ অবস্থানকে ‘নীরব স্নায়ুযুদ্ধের খেলা’ হিসেবে দেখছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এআই উন্নয়নে দেশগুলোকে উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সদিচ্ছাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, হুমকি, সংঘাত ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক এআই শাসন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসও আমোদেইয়ের প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছে, এর মূল লক্ষ্য চীনের এআই উন্নয়ন ঠেকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখা।
বিনিয়োগে বিশাল ব্যবধান, তবু চ্যালেঞ্জ চীনের
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এআই সূচক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এআই খাতে প্রায় ২৮ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। একই সময়ে চীনের বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনেও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে।
তবে কম খরচে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করে চীনা স্টার্টআপ ডিপসিক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, এনভিডিয়ার এইচ৮০০ চিপ ব্যবহার করে তাদের সর্বশেষ মডেল প্রশিক্ষণে ৬০ লাখ ডলারেরও কম খরচ হয়েছে। বিপরীতে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৪ প্রশিক্ষণে খরচ হয়েছিল ১০ কোটি ডলারের বেশি।
ডিপসিকের সাফল্য দেখিয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করাই উন্নত এআই তৈরির একমাত্র পথ নয়। এর প্রভাব পড়েছে মার্কিন প্রযুক্তি শেয়ারবাজারেও।
অন্য খাতেও প্রতিযোগিতা ছড়াচ্ছে
চীনের কাছে সবচেয়ে উন্নত এআই চিপ রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে এনভিডিয়ার সর্বশেষ প্রজন্মের চিপ চীনে সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। অন্যদিকে বিরল মাটির ধাতু রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে বেইজিং।
এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিদ্যুৎও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় চীনের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় এ ক্ষেত্রেও দেশটি সুবিধা পাচ্ছে।
অর্থাৎ এআই প্রতিযোগিতা এখন শুধু মডেল তৈরি কিংবা চিপ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চিপ, বিদ্যুৎ, ডেটা, খনিজ সম্পদ ও প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও দুই দেশের প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
সামরিক ক্ষেত্রে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার
এআই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি এর সামরিক ব্যবহার। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে এআই ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন গোয়েন্দা কার্যক্রম ও যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী এআই ব্যবহার করে তথ্য বিশ্লেষণ করেছে বলেও পেন্টাগন জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের গাজা যুদ্ধে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইসরাইলের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এআইয়ের সামরিক ব্যবহার নিয়ে অ্যানথ্রোপিকের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর। পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র কিংবা ব্যাপক গণনজরদারিতে নিজেদের মডেল ব্যবহার না করার অবস্থান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পেন্টাগনের বিরোধও তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা নাকি আধিপত্য?
এআই নিরাপত্তার নামে চীনকে প্রযুক্তিগতভাবে আটকে রাখার মার্কিন কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এআই নাও ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আয়া ইব্রাহিমের মতে, প্রযুক্তি নেতারা যখন এআইয়ের গতি কমানোর কথা বলছেন, তখন তাদের নিজেদের এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও ইচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, বিপুল অর্থনৈতিক চাপের কারণে কোম্পানিগুলো আরও শক্তিশালী এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় নামছে। ফলে ‘কে আগে এগিয়ে যাবে’ এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত সবাইকে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে বাধ্য করছে।
এ প্রতিযোগিতার ফল কী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একদিকে এআই অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্যদিকে একই প্রযুক্তি সামরিক সংঘাত, নজরদারি, সাইবার হামলা ও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
স্পেনের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি ঘোষণাপত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কেউই যোগ দেয়নি। ফলে এআইয়ের সামরিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরির পথও কঠিন হয়ে উঠছে।
এআইকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতা অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন এ প্রতিযোগিতার গতি আরও বাড়াতে চাইছে, তখনই আলাপ উঠেছে, ‘এআই যুদ্ধে’ জয়ের পর বিশ্ব কোন পথে যাবে?
—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে