ভারত-চীন: সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক লাভ
সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারতের মাটিতে পা রাখেন। নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠককে সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। প্রায় এক দশক ধরে সীমান্ত বিরোধের কারণে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপ স্থবির ছিল। ব্রিকসের নিরপেক্ষ মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশ সীমান্ত সমস্যাকে আলাদা রেখে বাণিজ্যিক সহযোগিতা এগিয়ে নেয়ার বার্তা দিয়েছে। এতে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বাড়বে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল: কারখানার মালিকদের সুযোগ
ব্রিকসের ৩০০ কোটির বেশি ভোক্তার বাজার নিয়ে গঠিত এই জোট বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে গ্লোবাল ভ্যালু চেইন অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৬-২০৩০ গ্রহণ করেছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদনকারীদের বাজার সুবিধা বাড়বে এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেন সহজ হবে। মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো তুলা ও কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশের জোটে যোগদানের ফলে ভারত ও চীনের পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ শৃঙ্খল আরও মজবুত হবে।
সোভটেক্স ও রিম্যাটেরিয়ালের সহপ্রতিষ্ঠাতা সোনিল জৈন বলেন, ‘রাশিয়া, ব্রাজিল বা ইউএইর সঙ্গে কাপড় রপ্তানির ক্ষেত্রে ডলার ক্লিয়ারিং ফি ছাড়া দ্রুত ও সস্তায় লেনদেন সম্ভব হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার মডেল ব্রিকসজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে ভারতের একজন ক্ষুদ্র তাঁতি বা মিসরের একজন কারিগর সরাসরি বহুদেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।’
পরিবেশগত শুল্কের বিরুদ্ধে একাট্টা অবস্থান
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত সমন্বয় প্রক্রিয়ার (সিবিএএম) তীব্র বিরোধিতা করেছে ব্রিকস। নয়াদিল্লি ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘একতরফা, শাস্তিমূলক, বৈষম্যমূলক ও সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপের বিরোধিতা করছি আমরা, যা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতে, এই পরিবেশগত শুল্ক টেক্সটাইল ও ইস্পাতের মতো শিল্পের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
ডলারবিকল্প ও মার্কিন চাপ: সতর্ক ভারসাম্য
গত বছর ব্রিকস সম্মেলনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ডলারবিকল্প মুদ্রা চালুর চেষ্টা করলে ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে এবং মার্কিনবিরোধী নীতিতে যুক্ত হলে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। এই পটভূমিতে এবারের সম্মেলনে ডলারবিকল্প মুদ্রা নিয়ে আলোচনা সতর্কভাবে হয়েছে। ঘোষণাপত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, ‘একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, যা ডব্লিউটিও নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’
মোদি সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা কারও বিরুদ্ধে নই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
চীনের প্রস্তাব ও আগামীর পরিকল্পনা
শি জিনপিং সম্মেলনে স্মার্ট কারখানা তৈরি ও ব্রিকস বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘চীন ব্রিকস দেশগুলোকে স্মার্ট কারখানা তৈরি ও মানদণ্ড নির্ধারণে সহায়তা করতে প্রস্তুত।’ আগামী বছর চীন ব্রিকসের সভাপতিত্ব গ্রহণ করবে, ফলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর আসবে।
কে কে ছিলেন সম্মেলনে
সরাসরি অংশ নেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবিয় আহমেদ আলী ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। ব্রাজিল ও সৌদি আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠায়। অংশীদার দেশ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ ও ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্ডিনান্ড মার্কোস জুনিয়র।
সোনিল জৈন পুরো বিষয়টি সংক্ষেপে বলেন, ‘এই সম্মেলন কোনো শেষ সীমা নয়, এটি নতুন যাত্রার শুরুর সংকেত।’
—সোর্সিং জার্নালের প্রতিবেদনে অবলম্বনে