মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রংপুরের বদরগঞ্জ থানার কাজীপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কাজীপাড়া এলাকার আবু সায়েদের ছেলে শামসুল সরকার ওরফে মন্ত্রী (৩৩), একই এলাকার এনামুল হকের ছেলে নুরনবী ইসলাম ওরফে নয়ন (২৭) এবং আমিনুল ইসলামের ছেলে শামসুল আলম (২৬)।
পুলিশ ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে গাবতলীর নারুয়ামালা এলাকার কনিকা আক্তারের বাড়িতে দুই ব্যক্তি মাদ্রাসার জন্য পবিত্র কোরআন শরিফ দানের কথা বলে যান। কথাবার্তার একপর্যায়ে কনিকার সঙ্গে তাদের পরিচয় ও সখ্যতা তৈরি হয়। কোরআন শরিফ কেনার কথা বলে তারা কনিকার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নেন।
এর কিছুদিন পর ওই দুই ব্যক্তি আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে কনিকার বাড়িতে যান। সঙ্গে থাকা দুজনকে মাদ্রাসার ছাত্র পরিচয় দিয়ে তাদের পোশাক কেনার জন্য ২ হাজার ১০০ টাকা চাওয়া হয়। ধর্মীয় ও মানবিক বিশ্বাসের জায়গা থেকেই কনিকা ওই টাকা দেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর আসে প্রতারণার মূল পর্ব। গত ৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ওই চার ব্যক্তি গাবতলী উপজেলার নারুয়ামালা ইউনিয়নের হাপানিয়া গ্রামে কনিকার বাড়িতে যান। তারা কনিকা অসুস্থ দাবি করে কবিরাজি চিকিৎসার কথা বলেন এবং তেলপড়া দিয়ে শরীরে মালিশ করতে বলেন। তাদের দেওয়া তেল কনিকা শরীরে মাখেন।
একপর্যায়ে ঘরের ভেতর গোলাপজল ছিটিয়ে কনিকার স্বর্ণালংকার খুলে দিতে বলা হয়। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে। এই সুযোগে তার স্বর্ণালংকার নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন কনিকা।
শুধু স্বর্ণালংকার নিয়েই তারা থামেননি—চিকিৎসার ‘নিয়ম’ হিসেবে সাত দিনের আগে ওই অলংকার দেখতে নিষেধ করা হয়। বলা হয়, এর আগে স্বর্ণালংকার দেখা হলে চিকিৎসা কাজে আসবে না এবং সংসারে ক্ষতি হতে পারে। একই সময় কবিরাজি চিকিৎসার খরচ বাবদ কনিকার কাছ থেকে আরও ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি পেশাদার প্রতারক চক্রের সদস্য। তাদের কৌশলের শুরু হয় ধর্মীয় আবেগ ও দানের বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে। পরে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা বা নানা ধরনের কৌশলের কথা বলে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ চক্রটি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে একই ধরনের প্রতারণা করে আসছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গাবতলী মডেল থানার ওসি রাকিব হোসেন বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি পেশাদার প্রতারক চক্রের সদস্য। তারা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য দানের কথা বলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। পরে বিভিন্ন কৌশলে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যান। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
ধর্মীয় অনুভূতি, মানুষের অসহায়ত্ব এবং চিকিৎসার প্রতি আস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার এমন অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে অপরিচিত ব্যক্তির কথায় ধর্মীয় দান, চিকিৎসা বা অলৌকিক সমাধানের নামে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী তুলে দেওয়ার আগে পরিচয় ও তথ্য যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।