অথচ ভারতের মেঘালয় ও সিলেটের ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর ও বালি ছাতক হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহন করা হয়। ছাতকে সুরমা নদীর পাশে গড়ে উঠেছে শত শত পাথর ও চুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
পাথর ও চুন ব্যবসার পাশাপাশি ছাতকের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান যেমন লাফার্জহোলসিম, আকিজ পেপার মিল, ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, নিটল মোটরসের সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল সহ বিভিন্ন ছোট বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারী ব্যবসা ও চাকুরী করেও জীবীকা নির্বাহ করেন অনেকে।
এদিকে চাকুরী ও ব্যবসার বাইরে ছাতকের মানুষের উপার্জনের মূল উৎস্য কৃষি কাজ ও মৎস্য আহরণ। কিন্তু দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে এখানকার কৃষি জমির বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ এলাকায় বন্যা পরবর্তী কৃষি জমি চাষের অনুকুল হলেও ছাতকে বন্যার প্রভাবে জমির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে ভৌগলিক কারণেই কৃষি জমির পরিমান কমছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছাতকের নোয়ারাই ইউনিয়নের। এই ইউনিয়নের এক ফসলি জমিগুলো পলি পড়ে উচ্চতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সেচ সুবিধা না থাকায় এবং জমিতে পানি ধারণ ক্ষমতা না থাকায় বোরো আবাদ করা যাচ্ছে না।
এমনি ৩৪ বিঘা জমির মালিক নোয়ারাই এর মাহবুব আলম রাসেল। তিনি জানান তাঁর পূর্ব পুরুষেরা জমি সংস্কার করতো। উচ্চতা বেড়ে গেলে জমি খনন করে তা আবার চাষযোগ্য করে তোলা হতো। তখন জমি খনন খরচ কম ছিল। কিন্তু এখন জমি খনন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিঘা প্রতি লাখ টাকারও বেশি। এত টাকা খরচ করে বোরো চাষ করা পোষায় না।
চাষযোগ্য না হওয়ায় তিনি এই জমি বিক্রিও করতে পারছিলেন না, জমি থেকে কোনো আয়ও করতে পারছিলেন না, আবার এত টাকা খরচ করে জমি খননও করতে পারছিলেন না। তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি মৎস্য খামার করার। প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে করতে পারছিলেন না।
তিনি জানালেন, এমনি এক পরিস্থিতি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে ছাতকের নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিম।
২০১০ সালে লাফার্জহোলসিম এর স্থানীয় এক ঠিকাদারের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন কোম্পানিটি ক্লিংকার উৎপাদনের জন্য মাটি কিনবে। তিনি তাঁর জমি থেকে মাটি বিক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জমি পরিদর্শণ করে মাটি সংগ্রহ কাজ শুরু হয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে ২/৩ ফুট মাটি খনন করে তা কিনে নেয় কোম্পানিটি। এতেই ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় রাসেলের। তিনি পেয়ে যান মৎস্য খামার করার প্রয়োজনীয় মূলধন। সেই মূলধন কাজে লাগিয়ে নিজ উদ্যোগে আরো কিছুটা গভীর করে জমি খনন করে নির্মাণ করেন পুকুর। অতিরিক্ত মাটি দিয়ে পুকুরের পাড় দেয়া হয়। এভাবে তিনটি পুকুর নির্মাণ করেছেন তিনি।
এর মধ্যে দুইটি পুকুরে করেন রুই ও কাতলার চাষ এবং আরেকটিতে প্রাকৃতিক ভাবে বন্যার সময় পানির সাথে তাঁর পুকুরে আসে কৈ, শিং, মাগুর, শোল সহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ। বন্যার পানি নেমে গেলে তিনি সংগ্রহ করেন দেশীয় প্রজাতির এই মাছ। নিজের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের চাহিদা মিটিয়ে প্রতি বছর সব খরচ বাদ দিয়ে তিনি প্রায় ৬/৭ লাখ টাকার মাছ বাজারে বিক্রি করেন। শুধু তাই নয় পুকুর পাড়ে তিনি বিভিন্ন শীতকালীন সবজিও চাষ করেন। গত বছর নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে তিনি প্রায় ৫০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেছেন।
ছাতকে তাঁর মতো আরো বেশ কয়েকজন জমির মালিক এভাবে জমির মাটি বিক্রি করে পতিত জমিতে মৎস্য খামার করে সাবলম্বী হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন কোম্পানি যদি তাঁর জমির মাটি ক্রয় না করত, তাহলে এই জমি অনাবাদীই পড়ে থাকতো। কোনো কাজে আসত না। তাই তিনি লাফার্জহোলসিম এর কাছে কৃতজ্ঞ।
এ বিষয়ে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্ল্যান্ট ম্যানেজার অরুন সাহার সাথে কথা হলে তিনি জানান, কোম্পানির স্বয়ংসম্পূর্ণ এই নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ক্লিংকার তৈরির জন্য মাটি প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে অনাবাদী জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। মাটি সংগ্রহের পর জমির মালিকদের সেই জমিকে চাষাবাদযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সার ও বীজ সরবরাহ করা হয় কোম্পানির পক্ষ থেকে। এই প্রক্রিয়ায় জমির মালিক ও কোম্পানি উভয়েই লাভবান হয়। এলাকার অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে সাবলম্বী হয়েছেন।