মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানা যায়, ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং জেলার মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিরোধে ২০১২ সালে ‘মুহুরী-কহুয়া এফসিডিআই’ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছিল। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় তা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের প্রলয়ংকরী বন্যায় ফেনী জেলার প্রতিটি উপজেলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেই স্থায়ী সংকট সমাধানের লক্ষ্যেই এই নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্প অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বিদ্যমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, একটি আধুনিক হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ, তিনটি নতুন রেগুলেটর এবং ২৭টি বিদ্যমান সেচ অবকাঠামোর পুনর্বাসন কাজ সম্পন্ন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার কৃষিজমিসহ আনুমানিক ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া বার্ষিক পৌনে চার লাখ টন অতিরিক্ত শস্য ও মৎস্য সম্পদ উৎপাদন বন্যার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ২ হাজার ৩৭০ জন এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
এই প্রকল্প অনুমোদনের খবর ফেনীতে পৌঁছালে বন্যায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। পরশুরাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এম এ হাসান বলেন, স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এই অঞ্চলটি বন্যা মুক্ত হবে বলে আমরা আশা করছি। এ জন্য কঠোর নজরদারির মাধ্যমে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল ও ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন জানান, এই জনদাবি পূরণ করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বিএনপি সরকারের মাধ্যমেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। আশা করছি এ টেকসই বাঁধ নির্মাণের ফলে আমরা ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল থেকে সৃষ্ট বন্যা থেকে পরিত্রাণ পাব। প্রধানমন্ত্রী ফেনীর উন্নয়নের জন্য বাকি দাবিগুলো দ্রুত পূরণ করবেন বলে প্রত্যাশা।
এদিকে দীর্ঘদিন বন্যায় সর্বস্ব হারানো ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছরই বাঁধ ভেঙে তাদের ঘরবাড়ি ও ফসল তলিয়ে যেত। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে নদীখনন এবং স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হলে তারা স্থায়ীভাবে বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাবেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ মাঠে নামানোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম মজনু বলেন, ফেনীর দীর্ঘদিনের একটি জনদাবি প্রধানমন্ত্রী পূরণ করেছেন। বাঁধটি যাতে টেকসই এবং গুণগত মানসম্পন্ন হয়, সেজন্য আমাদের তদারকি অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, প্রকল্পটি পাস হওয়ায় আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। প্রকল্পটির বিষয়ে আমি ইতোপূর্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে বারবার তাগাদাপত্র দিয়েছিলাম। বিশেষ করে ২০২৪ এর বন্যা পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে যে অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে তা যেন আর না হয়। যেহেতু জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা নেই, তাই আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে পারব।