দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষার পরও নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়ায় হতাশা থেকে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী কৃষক বিনয় চন্দ্র বর্মন। তিনি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকায় সেতু থাকলেও নেই সংযোগ সড়ক। সেতুর দুইপাশে দেওয়া হয়েছে বাঁশের সাঁকো। আর সেই সাঁকো দিয়েই যাতায়াত চলছে ১০ গ্রামের মানুষের। প্রায় ১০ বছর ধরে চলে আসা এই জনদুর্ভোগে স্থানীয়দের ক্ষোভ আর হতাশা বাড়লেও নিরব কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়রা বলছেন, জরাজীর্ণ সেতুটি এখন স্থানীয় হাজারো মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদ। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেতুটির একটি অংশ একপাশে মারাত্মকভাবে হেলে পড়েছে। এছাড়া মূল কাঠামোর দুই পাশের সংযোগস্থল ধসে যাওয়ায় সেখানে অস্থায়ীভাবে কাঠের পাটাতন বসিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নড়বড়ে এই কাঠের ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে ইউএসএআইডি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে, কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় ও এলজিইডির বাস্তবায়নে ৩৭ লাখ ২৪ হাজার ১৮৩ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, যেকোনো সময় ব্রিজটি ধসে পড়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মৌলভীবাজার এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় বাধ্য হয়েই আতঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ব্যবহার করছেন এলাকাবাসী।
তারা আরও জানান, সেতুটির এমন বেহাল অবস্থার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। কৃষকরা নিরাপদে তাদের উৎপাদিত ফসল হাটে-বাজারে নিতে পারছেন না। তারা বিভিন্নভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। রাতের বেলায় সেতুটি দিয়ে চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী জানান, বন্যার সময় আমাদের যন্ত্রণা, দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রতিবছর সেতুর দুই পাশের মাটি সরে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। কেউ ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। সেতুর ওপর উঠলে নড়বড়ে অবস্থা বোঝা যায়। এসব তো প্রশাসনের লোকজনের চোখে পড়ে না।
এ বিষয়ে রংপুর-৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা) আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কাছে বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসী আবেদন করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেতু নির্মাণে নতুন করে কোনো তথ্য জানতে পারেননি তারা।
ইউপি সদস্য হাফিজার রহমান বলেন, সমস্যাটি সমাধানে চেয়ারম্যান সাহেবকে অনেকবার বলেছি। কিন্তু পরিষদ থেকে এত বড় সেতু নির্মাণ করার মতো টাকা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে চেয়ারম্যান নিজেও উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে বিষয়টি তুলে ধরে আবেদন করেছেন।
বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বলেন, গতবছর মাটি কেটে ভরাট করেছিলাম। কিন্তু ভারীবর্ষণ আর সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিতে আবারও ভেঙে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুটি ভেঙে নতুন করে সেতু নির্মাণ করাটা খুবই জরুরি। এজন্য প্রকৌশল দপ্তরে বেশ কয়েকবার আবেদনও করেছি। এখনও কোনো কাজ হয়নি। শুনেছি ঢাকায় প্রস্তাব পাঠিয়েছে কিন্তু করে কি হবে, তা জানা নেই।
কাউনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, মৌলভীবাজার এলাকার সেতুটি নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদনও মিলেছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি ও টোপোগ্রাফিক সার্ভেও সম্পন্ন হয়েছে। এখন এটি নকশা পর্যায়ে রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই দরপত্র অনুমোদন হবে। এরপরই সেখানে নতুন করে সেতু নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।