বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

যুক্তরাজ্যের খবর

যুক্তরাজ্যে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মানবপাচার চক্রের অর্থ লেনদেন

যুক্তরাজ্যে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মানবপাচার চক্রের অর্থ লেনদেন

অবৈধভাবে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে মানবপাচারকারীরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তিন মাসব্যাপী গোপন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক তথ্য।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারকারীরা শুধু ফ্রান্সের উপকূল নয়, বরং যুক্তরাজ্যের ভেতরেও বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও দোকান ব্যবহার করে ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপারের অর্থ লেনদেন পরিচালনা করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি মানবপাচার চক্রের কার্যক্রমে নতুন ও অত্যন্ত সংগঠিত এক কৌশল।

বিবিসির গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের উলউইচ এলাকার একটি মোবাইল ফোনের দোকানের কর্মচারীরা এক আন্ডারকভার সাংবাদিককে জানাচ্ছেন, প্রায় ৩ হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ তাদের কাছে জমা রাখা যাবে এবং অভিবাসীরা নিরাপদে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর সেই অর্থ ফ্রান্সে থাকা পাচারকারীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

দোকানের এক কর্মচারী সাংবাদিককে বলেন,

“আপনি টাকা এখানে রাখবেন। আপনার লোকজন যদি পৌঁছে যায়, তাহলে আর ফিরে আসার প্রয়োজন হবে না।”

মানবপাচার চক্রের কার্যক্রম বোঝার জন্য বিবিসির এক সাংবাদিক সন্তানসহ অবৈধভাবে চ্যানেল পার হওয়ার ইচ্ছুক অভিবাসীর পরিচয়ে ফ্রান্সের ডানকার্ক এলাকার একটি অভিবাসী শিবিরে প্রবেশ করেন। “দ্য জঙ্গল” নামে পরিচিত ওই শিবিরে শত শত অভিবাসী ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে।

সেখানে পৌঁছানোর অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং বিভিন্ন পাচারচক্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

একজন সাংবাদিককে “জিয়া” নামের এক পাচারকারীর কাছে নিয়ে যায়। জিয়া দাবি করে, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ দোকানে চ্যানেল পারাপারের অর্থ জমা দেওয়া যায়।

সে বলে, “লন্ডনে তারা কোনো রসিদ দেয় না। তারা আমাকে ফোন করে জানায় টাকা পেয়েছে। আপনি পার হলেই তারা আমাকে টাকা পাঠিয়ে দেয়।”

আরেক মধ্যস্থতাকারী সাংবাদিককে “আহমাদ” নামের আরেক পাচারকারীর ফোন নম্বর দেয়। নিজেকে আফগানিস্তানের নাগরিক পরিচয় দেওয়া আহমাদ দাবি করেন, তিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তর ফ্রান্সে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

তিনি সাংবাদিককে জানান, যুক্তরাজ্যের অন্তত তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়া সম্ভব। এর মধ্যে উলউইচের “এএফজি মোবাইল রিপেয়ার” নামের মোবাইল ফোনের দোকানও রয়েছে। দুইজনের চ্যানেল পারাপারের জন্য তিনি ২ হাজার ৭০০ পাউন্ড দাবি করেন।

যুক্তরাজ্যের কোম্পানির ব্যাংক হিসাব ব্যবহার

বিবিসির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আহমাদ সাংবাদিককে যুক্তরাজ্যের আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব দেন। এর একটি নিউক্যাসল আপন টাইন এলাকার একটি পাইকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যটি ক্যামব্রিজশায়ারের একটি গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান।

শুধু যুক্তরাজ্য নয়, ইউরোপের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও এই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পের একটি গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান এবং ফ্রান্সের প্যারিসের একটি রেস্টুরেন্ট, যেখানে নগদ অর্থ জমা নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

পরে যুক্তরাজ্যে ফিরে বিবিসির সাংবাদিকরা উলউইচের ওই ফোনের দোকানে একাধিকবার যান এবং গোপনে কথোপকথন ধারণ করেন। সেখানে দোকানের এক কর্মচারী বলেন, অভিবাসীরা সফলভাবে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পরই পাচারকারীদের কাছে অর্থ পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, “আপনার লোকজন যদি পার হতে না পারে, আর সে যদি আমাকে টাকা ফেরত দিতে বলে, তাহলে আমি ফেরত দেব।” তবে একই সঙ্গে তিনি ছোট নৌকায় যাত্রার ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেন।

তার ভাষায়, “ নৌকার ওপর ভরসা করা যায় না। আল্লাহ না করুন, নৌকা ডুবে গেলে সবাই মারা যেতে পারে।” যদিও পরে মুখোমুখি করা হলে দোকানের কর্মচারী মানবপাচারের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তাদের ব্যবসা শুধুই মোবাইল ফোনের দোকান।

বিবিসির অনুসন্ধানে থাকা তিনটি প্রতিষ্ঠানই যুক্তরাজ্যের সরকারি ব্যবসা নিবন্ধন সংস্থা “কোম্পানিজ হাউজ”-এ নিবন্ধিত। তদন্তে দেখা গেছে, পাচারকারী আহমাদ যে ব্যাংক হিসাবগুলোর তথ্য দিয়েছিলেন, সেগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঠিক হিসাব।

নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান “রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট”-এর আর্থিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিভাগের পরিচালক টম কিটিং বলেন, “এটি দেখাচ্ছে যে মানবপাচারকারীরা এখন এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে যে তারা প্রকাশ্যেই বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করছে।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্য সরকার মানবপাচার চক্র “ধ্বংস” করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পাচারকারীরা তাতে খুব বেশি আতঙ্কিত নয় বলেই মনে হচ্ছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সন্দেহভাজন মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছিলেন, “যদি অর্থনির্ভর কোনো চক্রকে ধ্বংস করতে চান, তাহলে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করুন।” তবে বাস্তবে সেই অর্থ উদ্ধার করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

কোটি কোটি পাউন্ডের অবৈধ আয়

যুক্তরাজ্যের ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে দণ্ডিত মানবপাচারকারীদের অবৈধ আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এই সময়ে আদালত ৪৫ জন মানবপাচারকারীর মোট ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড অবৈধ আয় শনাক্ত করলেও বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৯ লাখ পাউন্ডের সম্পদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে প্রায় ১৬ লাখ পাউন্ড।

সম্প্রতি কার্ডিফে দুই মানবপাচারকারীকে শত শত অভিবাসীকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে সহায়তার দায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তাদের অধিকাংশ অর্থ বিদেশে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি।

সংস্থাটির উপপরিচালক ড্যান কানাটেলা-বারক্রফট বলেন, বর্তমানে মানবপাচার চক্রের শীর্ষ পর্যায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০টি সক্রিয় তদন্ত চলছে।

তিনি বলেন, “আমরা নিশ্চিত যে যুক্তরাজ্যকে তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন জায়গায় পরিণত করছি।”

অন্যদিকে অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী মাইক ট্যাপ বলেন, মানবপাচারকারীদের অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক সনাক্ত করতে “পর্দার আড়ালে ব্যাপক তদন্ত” চলছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে যদি মানবপাচারকারীরা আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে ইংলিশ চ্যানেল ঘিরে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো যুক্তরাজ্যের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

সূত্রঃ বিবিসি

আরও

যুক্তরাজ্যে ‘কনভার্সন থেরাপি’ নিষিদ্ধের পরিকল্পনা ঘোষণা রাজা চার্লসের, খসড়া বিল আনছে লেবার সরকার

যুক্তরাজ্যের খবর

যুক্তরাজ্যে ‘কনভার্সন থেরাপি’ নিষিদ্ধের পরিকল্পনা ঘোষণা রাজা চার্লসের, খসড়া বিল আনছে লেবার সরকার

যুক্তরাজ্যে সমকামী, উভয়কামী ও রূপান্তরকামীসহ এলজিবিটিকিউ (LGBTQ+) সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় 'কনভার্সন থেরাপি' বা রূপান্তর চিক...

২০২৬-০৫-১৯ ১০:০৫

যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন অভিবাসন: ওএনএস ও অক্সফোর্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য

যুক্তরাজ্যের খবর

যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন অভিবাসন: ওএনএস ও অক্সফোর্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য

যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অভিবাসন অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে...

২০২৬-০৫-১৯ ১০:০২

লাফিং গ্যাস আসক্ত চালক ধরতে যুক্তরাজ্যে পুলিশের বিশেষ ব্রেথালাইজার ট্রায়াল

যুক্তরাজ্যের খবর

লাফিং গ্যাস আসক্ত চালক ধরতে যুক্তরাজ্যে পুলিশের বিশেষ ব্রেথালাইজার ট্রায়াল

যুক্তরাজ্যে লাফিং গ্যাস (নাইট্রাস অক্সাইড) গ্রহণ করে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো রোধে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির...

২০২৬-০৫-১৯ ০৮:৫৩

যুক্তরাজ্যে বেনিফিট ব্যবস্থায় ব্যাপক জালিয়াতি ও সরকারি ভুল: নেট ক্ষতি ৮.৬ বিলিয়ন পাউন্ড

যুক্তরাজ্যের খবর

যুক্তরাজ্যে বেনিফিট ব্যবস্থায় ব্যাপক জালিয়াতি ও সরকারি ভুল: নেট ক্ষতি ৮.৬ বিলিয়ন পাউন্ড

যুক্তরাজ্যের বেনিফিট (কল্যাণ ভাতা) ব্যবস্থায় বড় ধরনের জালিয়াতি এবং বিপুল অংকের অর্থ ভুলভাবে লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্র...

২০২৬-০৫-১৮ ১৯:২৮

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন: কঠোর নিয়মের মুখে ওয়ার্ক পারমিট ও ফ্যামিলি ভিসা

যুক্তরাজ্যের খবর

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন: কঠোর নিয়মের মুখে ওয়ার্ক পারমিট ও ফ্যামিলি ভিসা

ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে নিজেদের অভিবাসন নীতিতে ধারাবাহিক ও আমূল পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাজ্য। দেশটি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে এক...

২০২৬-০৫-১৮ ১৯:২১

ব্রিটিশ গ্যাসের গ্রাহকদের জন্য সুখবর: ২০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি

যুক্তরাজ্যের খবর

ব্রিটিশ গ্যাসের গ্রাহকদের জন্য সুখবর: ২০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি

যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'ব্রিটিশ গ্যাস'-এর গ্রাহকদের জন্য একটি বড় সুখবর এসেছে। প্রতিষ্ঠা...

২০২৬-০৫-১৮ ১৯:১৯