তিনি বলেন, সিএনওওসি চীনের একটি বড় প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম রয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়টি কোম্পানি দরপত্রের তথ্য কিনেছে। আন্তর্জাতিক অফশোর বিডিং রাউন্ডে অনেক কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সিএনওওসি চীনের বোহাই, পূর্ব চীন ও দক্ষিণ চীন সাগরসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও ইউরোপের ২০টিরও বেশি দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। ২০১৩ সালে কানাডার তেল কোম্পানি নেক্সেন ইনকরপোরেটেড অধিগ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়।
২৬ ব্লকে অনুসন্ধানের সুযোগ
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি—মোট ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে।
দরপত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ডলার। নির্দিষ্ট কোনো ব্লক অথবা পুরো অফশোর এলাকার জন্য দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব।
আগের বিডিং রাউন্ডে সাড়া মেলেনি
এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ওই সময় মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিলসহ সাতটি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি কিনেছিল। দুটি কোম্পানি পেট্রোবাংলা থেকে প্রয়োজনীয় ডাটাও সংগ্রহ করে।
তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়নি। ফলে বিডিং রাউন্ড-২০২৪ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের খরচ, ডব্লিউপিপিএফ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করাসহ বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়।
এ ছাড়া গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্যের ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে গভীর সমুদ্রে ১১ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে সাড়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে মডেল পিএসসি-২০১৯-এ অগভীর ও গভীর সমুদ্রের জন্য যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ২৫ ডলার নির্ধারিত ছিল।
বিশাল সমুদ্রসীমা, অনুসন্ধানে ধীরগতি
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রাঞ্চলের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। সম্ভাবনাময় এই সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
বাংলাদেশের পাশের সমুদ্রাঞ্চল থেকে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলন করছে। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাতেও তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগের চুক্তিগুলোও টেকেনি
২০০৮ সালে ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ ব্লকের জন্য মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। পরে গ্যাসের মূল্যসহ কয়েকটি শর্ত সংশোধনের দাবি জানায় কোম্পানিটি। বাংলাদেশ তাতে সাড়া না দেওয়ায় ২০১৪ সালে কনোকোফিলিপস চুক্তি থেকে সরে যায়।
অন্যদিকে অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০১২-এর আওতায় এসএস-৪ ও এসএস-৯ ব্লকের জন্য ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
২০১৭ সালে এসএস-১২ ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালে পসকো দাইয়ুও ব্লকটি ছেড়ে চলে যায়।
২০১৬ সালে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে পিএসসি হালনাগাদ করা হলেও নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
বাড়ছে গ্যাস সংকট
দেশে বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, আটটি গ্রাহক শ্রেণিতে দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের লোড ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।
এর বিপরীতে দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬২৮ মিলিয়ন এবং আমদানি থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে।
গ্যাসের সংকটে নতুন সংযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে শিল্পায়ন ও উৎপাদন কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
একসময় দেশে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ২৯ আগস্ট তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান-স্থবিরতাকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গভীর সমুদ্রেই বড় আশা
স্থলভাগে নতুন কূপ খনন করেও বড় ধরনের গ্যাসের মজুত পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যমান উৎপাদন ধরে রাখাই ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে গভীর সমুদ্রই বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার জায়গা।
তবে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হলেও নতুন গ্যাস পাওয়া এবং তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে আগামী কয়েক বছরেও গ্যাস সংকট কমার বদলে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এক অনুষ্ঠানে বলেন, অনেক কোম্পানি বাংলাদেশের সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যোগাযোগ করছে। বিশেষ করে মার্কিন ও চীনা কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে। এবার অফশোর বিডিং রাউন্ড সফল হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।