রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে শত্রুজিৎপুর ল্যাব মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টিটো হোসেন ও রোগী হোসেন ফকিরের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হতে দেখা যায়।
শত্রুজিৎপুর গ্রামের রাজ্জাক ফকিরের ছেলে হোসেন ফকির পেশায় একজন দরিদ্র ভ্যানচালক। গত ১০ আগস্ট মুখের চোয়াল বাঁকা হওয়ার সমস্যা নিয়ে জেনারেল ফিজিশিয়ান মো. টিটো হোসেনের কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন তিনি। এ সময় নানা কৌশলে তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় বারইখালী গ্রামের সামছুর ফকিরের ছেলে বাবুল ফকির তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
একপর্যায়ে চিকিৎসক মো. টিটো হোসেন রোগী হোসেন ফকিরকে বলেন, ‘আমি আপনাদের নামে মানহানি মামলা দায়ের করব।’
টিটো হোসেন বলেন, রওশন জেনারেল প্রাইভেট হাসপাতাল, ঘোড়াশাল বাজার রোড, পল্লী বিদ্যুৎ গেট, পলাশ, নরসিংদী থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে এস ট্রপোনিন আই, সিরাম ভিটামিন ডি, এস ক্রিয়েটিনাইন, এস বিলিরুবিন, এসজিওটি, এসজিপিটি ও অ্যালকালাইন ফসফেটের পরীক্ষা করানো হয়েছে। তিনি বলেন, রোগীর কার্ডিওজেনিক শক বা হার্ট স্ট্রোক হয়েছে। এই পরীক্ষা যশোর, মাগুরা, ফরিদপুর ও ঢাকায় করা যায় না, নরসিংদীর রওশন জেনারেল প্রাইভেট হাসপাতালে করতে হয়।
তবে রোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট প্রথমে টিটো হোসেন তাঁর প্যাডে ওষুধ লিখে দেন। এরপর হাতে প্রেসক্রিপশন সাদা কাগজে লিখে দেন ১১ আগস্ট। পরে ওষুধ খাওয়ানো এবং হিউম্যান অ্যালবুমিন ২০ শতাংশের দুটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। প্রতিটির দাম ৪ হাজার ৫০০ টাকা, দুটি ইনজেকশনের দাম ৯ হাজার টাকা। এরপর ১৩ আগস্ট রওশন জেনারেল প্রাইভেট হাসপাতাল, নরসিংদী থেকে পরীক্ষার রিপোর্ট আনা হয়।
হোসেন ফকিরের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি টিটো হোসেনকে প্রথমে ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং পরে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দেন। বাড়ি থেকে তাঁর মেয়ে হোসনে আরার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পানি, অক্সিজেনসহ অন্যান্য বাবদ দেওয়া হয় আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা। বিষয়টি শত্রুজিৎপুর বাজারের ব্যবসায়ী ইয়াছিন জানেন বলে দাবি করা হয়েছে।
হোসেন ফকির বলেন, ‘প্রেসক্রিপশন করার পরে ঔষধ খাওয়ায় নিয়ে ও দুটো ৯ হাজার টাকার ইনজেকশন পুশ করায়ে তারপর আমাকে টেস্টের কাগজ ধরায়ে দিয়েছে। যেটা সম্পূর্ণ একটা প্রতারণা করে আমার কাছে থেকে ১৭ হাজার টাকা নিয়ে নিয়েছে চোখে ধুলো দিয়ে। এছাড়াও প্রথমে আমি চিকিৎসা নিতে আসলে সে মাগুরা সদর হাসপাতালের বড় ডাক্তার পরিচয় দিয়ে ছিল।’
তিনি বলেন, পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৩ আগস্ট মাগুরা ল্যাবএইড লিমিটেড (ডায়াগনস্টিক) এ এমবিবিএস চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এম এম এহসানুল হককে দেখান। তিনি ৭৫০ টাকার ওষুধ লিখে দেন। সেই ওষুধ সেবন করে এখন তিনি সুস্থ আছেন বলে জানান হোসেন ফকির। তাঁর অভিযোগ, অপচিকিৎসার সেবা দিয়ে ১৭ হাজার টাকা নেওয়া ও ভুল চিকিৎসা প্রদানের বিচার চান তিনি।
এ বিষয়ে মো. টিটো হোসেন ডিএমএফ (ঢাকা), সিপিআর (আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন) ও জেনারেল ফিজিশিয়ান হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি সঠিক চিকিৎসা দিয়েছেন এবং মাগুরা শহরে গিয়ে কথা বলবেন।
এদিকে অনুসন্ধানে টিটো হোসেনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রেসক্রিপশনে ব্যবহৃত রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ কর্তৃক অনুমোদিত ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ডিপ্লোমা ইন মেডিক্যাল এ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং কোর্সের তৃতীয় বর্ষ অর্থাৎ ফাইনাল ইয়ারে তিনি জুন ২০২৪ সালে পরীক্ষা দেন।
তাঁর পিতার নাম হানিফ শেখ এবং মায়ের নাম রাহেলা বেগম। পরীক্ষায় তাঁর রোল নম্বর ১৯০৩ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৪৪৯১১। ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত ফলাফলে তিনি তিনটি বিষয়ে অকৃতকার্য হন। বিষয়গুলো হলো বেসিক সার্জারি, বেসিক গাইনোকলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স এবং বেসিক কমিউনিটি মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ ম্যানেজমেন্ট। এর মধ্যে বেসিক সার্জারি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষায় তিনি ১৭ নম্বর পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ওই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৪৪৯১১-ই টিটো হোসেন তাঁর প্রেসক্রিপশন প্যাডে নামের নিচে ‘রেজিঃ নং’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এভাবে সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে অবৈধভাবে চিকিৎসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টিটো হোসেনের স্বাক্ষর করা তাঁর প্যাড ও সাদা কাগজের প্রেসক্রিপশন এবং রওশন জেনারেল প্রাইভেট হাসপাতাল, নরসিংদীর পরীক্ষার কাগজে ল্যাব ইনচার্জের স্বাক্ষর রয়েছে।
এলাকাবাসী ও মাগুরার সাধারণ মানুষ এ ঘটনায় মাগুরার সিভিল সার্জন, তত্ত্বাবধায়ক, পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, টিটো হোসেন যেন মাগুরা সদর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে ইন্টার্নশিপ করতে না পারেন। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবার মতো একটি পবিত্র পেশাকে কলঙ্কিত করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আইনের আওতায় কঠোর শাস্তি ও বিচার দাবি করা হয়েছে।
শত্রুজিৎপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুফতি ওসমান গনি মুছাপুরী জানান, শত্রুজিৎপুর ল্যাব মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগের সংবাদ তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তালা মেরে চলে যাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁর ইউনিয়নের শত্রুজিৎপুর গ্রামের এক দরিদ্র ভ্যানচালকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রতারণা করে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁর ইউনিয়ন পরিষদে এসে লোকজন ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাচ্ছেন।
মুফতি ওসমান গনি মুছাপুরী আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন, টিটো হোসেন মেডিকেল ফাইনাল ইয়ারে ফেল করে তাঁর মার্কশিটের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি বাংলাদেশের আইনে মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ। এ বিষয়ে তিনি মাগুরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে টিটো হোসেনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করছেন পাঠকেরা।