মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬ ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

সারা দেশ

২৬ বছর পর কালুর মুক্তি, এক পরিবারের ঘরে ফেরা: অন্য পরিবারের শূন্যতা

২৬ বছর পর কালুর মুক্তি, এক পরিবারের ঘরে ফেরা: অন্য পরিবারের শূন্যতা

একজনের জন্য এটি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। আরেকজনের পরিবারের কাছে একই সময়টা প্রিয়জন হারানোর ক্ষত বয়ে চলার ২৬ বছর। ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের আলোচিত দুলাল হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কালু দীর্ঘ কারাভোগ শেষে সোমবার (১৭ আগস্ট) ভোলা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কারাগারের ফটকে তাঁকে স্বজনরা ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। দীর্ঘদিন পর পরিবারের মানুষকে কাছে পেয়ে আনন্দে কেঁদেছেন তাঁর মা।

কিন্তু এই আনন্দের গল্পের অন্য প্রান্তে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। ২০০০ সালের হত্যাকাণ্ডে নিহত দুলালের পরিবারও সেই রাতের পর থেকে একজন স্বজনকে হারিয়ে বেঁচে আছে। দুলাল আর কোনো দিন ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে সেই শূন্যতা বছরের পর বছর।

কালুর মুক্তিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা গেছে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া। কেউ দীর্ঘ কারাভোগের পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনকে মানবিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত একজনের কারামুক্তিকে ঘিরে অতিরিক্ত উৎসব বা রাজকীয় সংবর্ধনা সমাজে কী বার্তা দেয়।

যে রাতে বদলে যায় দুই পরিবারের গল্প: মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে রাজাপুর ইউনিয়নের শান্তির হাট বাজার এলাকায় দুলাল নিহত হন। তবে ঘটনার কারণ ও বিবরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।

এক পক্ষের ভাষ্য, বিরোধপূর্ণ জায়গায় দোকানঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে দুলালের স্বজনদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, ওই রাতে শান্তির হাট বাজারে ডাকাতির খবর পেয়ে দুলাল সেখানে ছুটে যান এবং বাজারে পৌঁছানোর পর গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনার প্রকৃত কারণ ও কীভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল এ বিষয়ে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতের রায় ও মামলার নথিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

ঘটনার পর দুলালের ভাই মিলন মেম্বার বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় কালু ও শাহাবুদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত আসামিদের বিভিন্ন সাজা দেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়ায় কালু ও শাহাবুদ্দিনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা পরিবর্তিত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিণত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরপর কারাগারই হয়ে ওঠে কালুর জীবনের ঠিকানা।

২৬ বছরের বন্দিজীবন, বদলে গেছে সবকিছু: কারাগারে যাওয়ার সময় কালু ছিলেন তরুণ। তাঁর পরিবার, স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও স্বজনদের ঘিরে ছিল স্বাভাবিক জীবন। দীর্ঘ কারাবাসের সময়ে সেই জীবনই বদলে গেছে।

কালুর ভাষ্য, তিনি প্রায় ২৬ বছর দুই দিন কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকাকালে তিনি ‘মেট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বন্দিদের সেবা করেছেন। মুক্তির পরও মানুষের সেবা করতে চান তিনি।

কারাগার থেকে বের হয়ে কালু বলেন, তিনি কারও প্রতি রাগ বা ক্ষোভ রাখতে চান না। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও এলাকার মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চান। কারাগারে যেভাবে মানুষের সেবা করেছেন, সুযোগ পেলে এলাকার মানুষেরও সেবা করতে চান।
তিনি বলেন, দীর্ঘ কারাজীবন তাঁর জীবনের একটি কঠিন অধ্যায় ছিল। এখন আল্লাহর কাছে দোয়া চেয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান তিনি।

২৬ বছর পর ছেলে আমার কাছে ফিরেছে: কালুর মুক্তির খবরে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত তাঁর মা। দীর্ঘ সময় সন্তানকে কাছে না পাওয়ার কষ্টের পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন।

কালুর মা বলেন, দীর্ঘদিন পর সন্তান তাঁর কাছে ফিরে আসায় তিনি খুব খুশি। আল্লাহর রহমতে ছেলে ফিরে এসেছে এ জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি।

একজন মায়ের কাছে সন্তানের ফিরে আসা যে কত বড় আনন্দ, তাঁর কথাতেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু দুলালের পরিবার: কালুর পরিবারে আজ স্বজন ফিরে আসার আনন্দ। কিন্তু দুলালের পরিবারে ২৬ বছর আগের সেই শোক আজও শেষ হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুলালের স্বজন ও পরিচিতদের বিভিন্ন মন্তব্যে উঠে এসেছে দুলাল মারা যাওয়ার সময় তাঁর সন্তানরা ছোট ছিল। বাবাকে হারিয়ে তাঁদের কীভাবে বেড়ে উঠতে হয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, ২৭ বছর ধরে একটি পরিবার একজন মানুষকে হারিয়ে কীভাবে দিন কাটিয়েছে, সেই গল্পও সামনে আসা দরকার। তাঁর প্রশ্ন একজন দণ্ডিত ব্যক্তি সাজা শেষে মুক্তি পেলে পরিবার তাকে ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করতেই পারে, কিন্তু সেই মুক্তিকে যদি বিজয় বা বীরত্বের মতো উপস্থাপন করা হয়, তাহলে নিহতের পরিবারের অনুভূতির কী হবে?

আরেকজন মন্তব্য করেছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে বরণ করা স্বাভাবিক মানবিক বিষয়। কিন্তু হত্যা মামলায় দণ্ড ভোগ শেষে মুক্তিকে ‘রাজকীয় সংবর্ধনা’ দেওয়ার সামাজিক বার্তা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন।

ফেসবুকে প্রশ্ন মুক্তি কি আনন্দ, নাকি আত্মসমালোচনার সময়: কালুর মুক্তিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে, সেটি হলো একজন দণ্ডিত ব্যক্তি সাজা ভোগ শেষে সমাজে ফিরলে তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করা উচিত?

কেউ বলেছেন, দীর্ঘ কারাবাস শেষে তাঁর পরিবার স্বজনকে বরণ করতেই পারে। আবার কেউ মনে করছেন, এমন ঘটনায় উৎসবের পরিবর্তে অতীতের ঘটনা স্মরণ, নিহতের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা এবং ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের অঙ্গীকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মন্তব্যে বলা হয়েছে, দুলাল হত্যার পরও রাজাপুরে সহিংসতার আরও ঘটনা ঘটেছে। অতীতের এমন ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আধিপত্য ও বিরোধের রাজনীতি থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এই বিতর্কের মধ্যেই কালুর নিজের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, কারও প্রতি তাঁর রাগ বা ক্ষোভ নেই। তিনি এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চান এবং মানুষের সেবা করতে চান।

দুই পরিবারের দুই বাস্তবতা: কালুর কারামুক্তি একটি পরিবারের জন্য আনন্দের। ২৬ বছরের বন্দিজীবন শেষে একজন মানুষ তাঁর মা, স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের কাছে ফিরে এসেছেন।

অন্যদিকে দুলালের পরিবার ২৬ বছর ধরে যে মানুষটিকে হারিয়ে আছে, তাঁকে আর ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই দুই বাস্তবতাই একই ঘটনার দুই দিক।

একদিকে কারাগারের দরজা খুলেছে কালুর জন্য। অন্যদিকে দুলালের পরিবারের জন্য ২৬ বছর পরও বন্ধ হয়নি হারানোর দরজা।

নতুন জীবনের সামনে কালু: দীর্ঘ সাজা শেষে কালু এখন মুক্ত। আদালতের সাজা তিনি ভোগ করেছেন। তাই আইনগতভাবে তিনি তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অতীতের বিরোধ, সংঘাত ও রক্তাক্ত অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুন পরিচয়ে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।

কালু নিজেই বলেছেন, তিনি মানুষের সেবা করতে চান, কারও প্রতি তাঁর ক্ষোভ নেই এবং সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চান।

সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে শুধু ফুলের মালা কিংবা সংবর্ধনার দৃশ্য দিয়ে দেখলে গল্পের অর্ধেকই বলা হবে। পুরো গল্পে যেমন কালুর ২৬ বছরের বন্দিজীবন আছে, তেমনি আছে দুলালের পরিবারের ২৬ বছরের শূন্যতা।

শেষ পর্যন্ত এই ঘটনা রাজাপুরের সমাজকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সহিংসতার একটি ঘটনায় শুধু একজন মানুষ কারাগারে যায় না; তার সঙ্গে বহু মানুষের জীবনও বদলে যায়। কেউ কারাগারের ভেতরে বছর কাটান, কেউ বাইরে থেকেও প্রিয়জন হারানোর শোক বয়ে চলেন।

তাই কালুর মুক্তির নতুন অধ্যায়টি যদি সত্যিই নতুন হয়, তবে সেটির সবচেয়ে বড় পরিচয় হোক শান্তি, মানবিকতা, অনুশোচনা ও মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার। আর দুলালের পরিবারের দীর্ঘ শোকের প্রতিও থাকুক সমাজের সম্মান ও সহমর্মিতা।

আরও

ধামরাইয়ে ৯ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ নেই: জরাজীর্ণ ভবন আর জনবল সংকটে চরম ভোগান্তি

সারা দেশ

ধামরাইয়ে ৯ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ নেই: জরাজীর্ণ ভবন আর জনবল সংকটে চরম ভোগান্তি

ঢাকার ধামরাই উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দীর্ঘ দুই বছর ধরে সরকারি ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ভেঙে...

২০২৬-০৮-১৭ ২১:৫৮

রাস্তার ওপর পড়ে থাকা বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে জড়িয়ে কৃষকের মৃত্যু

সারা দেশ

রাস্তার ওপর পড়ে থাকা বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে জড়িয়ে কৃষকের মৃত্যু

পটুয়াখালীর বাউফলে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে জড়িয়ে ইউসুফ রাড়ি (৫০) নামে এক কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে...

২০২৬-০৮-১৭ ২১:৪১

সাটুরিয়ায় সাবেক ইউপি সদস্যের বাড়ি ভাংচুরের অভিযোগ, থানায় মামলা

সারা দেশ

সাটুরিয়ায় সাবেক ইউপি সদস্যের বাড়ি ভাংচুরের অভিযোগ, থানায় মামলা

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হরগজ ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. ইসমাইল হোসেনের বাড়িঘর ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে...

২০২৬-০৮-১৭ ২১:২০

মহেশপুরে ৩ মাস কাদায় বেঁধে রাখা সেই চার মহিষ ইউএনও'র হস্তক্ষেপে উদ্ধার

সারা দেশ

মহেশপুরে ৩ মাস কাদায় বেঁধে রাখা সেই চার মহিষ ইউএনও'র হস্তক্ষেপে উদ্ধার

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গোকুলনগর গ্রামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ হয় বুক সমান কাদায় বেঁধে রাখা সেই ৪টি মহিষ...

২০২৬-০৮-১৭ ২১:০৫