আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক মে দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের গান গাওয়া হচ্ছে, সালাউদ্দীনের মতো নিরাপত্তা প্রহরীদের কাছে সেই গান কেবলই দীর্ঘশ্বাস। তাদের কাছে মে দিবস মানে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই হাড়ভাঙা খাটুনি। নেই কোনো ছুটি, নেই কোনো বাড়তি পাওনা।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেল এক করুণ চিত্র। ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ পাহারায় নিয়োজিত এই রক্ষীদের নিয়োগ দেওয়া হয় মূলত আউটসোর্সিং বা ‘থার্ড পার্টি’ সিকিউরিটি এজেন্সির মাধ্যমে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অনুসন্ধানে দেখা যায়, একেকজন গার্ডের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এজেন্সিগুলোকে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা দিলেও রক্ষীদের পকেটে পৌঁছায় মাত্র ৯ থেকে ১২ হাজার টাকা। মাঝপথে মোটা অঙ্কের টাকা কেটে রেখে দিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সিগুলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সিকিউরিটি এজেন্সির কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী একজন গার্ডের বিপরীতে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বিল করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান মুনাফা ও প্রশাসনিক ব্যয়ের দোহাই দিয়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকাই কেটে রাখে। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনির পর প্রহরীদের হাতে থাকে নামমাত্র বেতন।
৯ বছর ধরে এই পেশায় আছেন ৬০ বছর বয়সী মো. হানিফ। বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের একটি বুথে কর্মরত এই বৃদ্ধের কাঁধে এখন পুরো পরিবারের বোঝা। আগে সাড়ে ১২ হাজার টাকা পেলেও এখন পাচ্ছেন ১১ হাজার ২০০ টাকা। হানিফ জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তার ছেলের চাকরি চলে যাওয়ায় সংসার চালানো এখন দুরূহ হয়ে পড়েছে।
গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও এই রক্ষীদের কপালে জোটে না কোনো ‘ঝুঁকি ভাতা’। অধিকাংশ এজেন্সিতে নেই উৎসব বোনাসের ব্যবস্থা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসের অর্ধেক পার হওয়ার পর মেলে বেতন। অভিযোগ রয়েছে, এজেন্সির বাইরেও সুপারভাইজাররা অনেক সময় প্রহরীদের কাছ থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে হাতিয়ে নেন।
চকবাজার এলাকায় একটি ইসলামী ব্যাংকের বুথে কর্মরত আলমগীর বলেন, ‘এজেন্সি আমাকে মাত্র সাড়ে ৯ হাজার টাকা দেয়। বেতন বাড়ানোর কথা বললে সরাসরি জানানো হয়– চাকরি করলে করুন, না করলে ছাড়ুন। কাজের লোকের অভাব নেই।’
সার্ভিস চার্জ কাটার বিষয়ে এলিট ফোর্সের সুপারভাইজার বিপ্লব জানান, এটি নিয়মের মধ্যেই পড়ে। তবে বিস্তারিত জানতে তিনি প্রধান কার্যালয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, জিফোরএস চট্টগ্রামের রিজিওনাল হেড ইমরান চৌধুরী জানান, তারা সরকারি নীতিমালা মেনেই কাজ করেন। একজন গার্ডের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্ম ও প্রশাসনিক ব্যয় বহনের জন্য প্রতিষ্ঠান সামান্য লভ্যাংশ রাখে, যা সাধারণত ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি নয়।
শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এবং চাকরির কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি না থাকায় এই বিশাল কর্মবাহিনী মুখ ফুটে নিজেদের অধিকারের কথা বলতেও সাহস পান না। বর্তমানে দেশে ৮০০টির বেশি নিবন্ধিত বেসরকারি সিকিউরিটি এজেন্সির অধীনে প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষ কাজ করছেন, যাদের জীবনের গল্পটা সালাউদ্দীন বা হানিফদের মতোই বঞ্চনার।