পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ প্রতিবেদন এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০ জুলাই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে দৈনিক ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ২৫ জুলাই তা কমে ৫০ কোটি ১১ লাখ ঘনফুটে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ কমেছে ৪৯ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট, যা প্রায় ৫০ শতাংশ।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ ২৬৪ কোটি ১ লাখ ঘনফুট থেকে নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ১৭ লাখ ঘনফুটে। সরকারি হিসাবে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ২০ জুলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯২ কোটি ৬৮ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ২৫ জুলাই তা কমে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ঘনফুটে নেমে আসে। পাঁচ দিনের ব্যবধানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট।
ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়। বিদ্যুৎের মোট উৎপাদনে গ্যাসের অংশ ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে।
ঘাটতি সামাল দিতে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলেও চাহিদার পুরোটা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ২৫ জুলাই রাত ১১টায় সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়, যা পাঁচ দিন আগের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যয়বহুল কয়লা ও তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলো বেশি চালাতে হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬ টাকা ৩১ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৯ পয়সায় পৌঁছেছে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
জনজীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায়। পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিতাসের গ্যাস বিতরণ কমেছে প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট।
রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বিদ্যুচ্চালিত চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল গুনতে হচ্ছে। শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশনেও গ্যাস সংকট উৎপাদন ও সেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভোগান্তির নানা চিত্র উঠে এসেছে। মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা দিনের পর দিন গ্যাস না থাকার অভিযোগ করেছেন। অনেকেই রাত বা ভোরে কয়েক দিনের রান্না একসঙ্গে করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংকট কাটতে আরও সময়
সমুদ্রপথে আমদানি করা এলএনজি মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এর একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ত্রুটিগ্রস্ত টার্মিনাল থেকে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রথম ধাপে দৈনিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, গৃহস্থালি, শিল্প ও সিএনজি খাতে যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার সচেতন। সমস্যাটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ত্রুটিজনিত হলেও জনগণের দুর্ভোগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।