রাজধানীতে গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে। গ্যাস সংকটের কারণে বাড়ছে নাগরিকদের ভোগান্তি। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিএনজিচালিত পরিবহণ খাত। গ্যাসের চাপ না থাকায় বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ চলছে অনেক কমেছে। অনেক পাম্প বন্ধও রাখা হচ্ছে। যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত পরিবহণে বেড়েছে ভাড়া। গ্যাসের অভাবে বাসাবাড়িতে রান্নাও হচ্ছে না অনেকের। রান্না করতে না পেরে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলে ভিড় করছে। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। নগরজীবনে সংসারের ব্যয়ও বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষজন পড়েছেন বেশি বিপাকে।
রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর পুরান ঢাকা, হাজারীবাগ, লালবাগ, ওয়ারী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, ডেমরা ও সবুজবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।
হাজারীবাগ: লালবাগ, ওয়ারীসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে টানা গ্যাস সংকট বাসিন্দাদের নিত্যদিনের চরম দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সরকার নির্ধারিত বিল পরিশোধ করেও গ্যাস না পাওয়ায় ফুঁসছেন বাসিন্দারা। অধিকাংশ বাসাবাড়িতে দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের কোনো চাপই থাকে না। কোথাও ভোররাত কিংবা গভীর রাতে অল্প সময় গ্যাস এলেও স্বাভাবিকভাবে রান্না শেষ করা যাচ্ছে না। ফলে অসংখ্য পরিবার বাইরের খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে ওয়ারী জোনের বংশাল, ইসলামপুর, সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, কোতোয়ালি ও সদরঘাট এলাকাতেও। বাসিন্দারা জানান, সকালে সন্তানদের টিফিন কিংবা অফিসগামী সদস্যদের খাবার প্রস্তুত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকে না খেয়েই কর্মস্থলে যাচ্ছেন।
লালবাগ শেখ সাহেব বাজার মন্দির গলির বাসিন্দা আরিফুর রহমান রনি জানান, দীর্ঘ তিন-চার দশকের বসবাসে এমন ভয়াবহ গ্যাস সংকট তিনি কখনো দেখেননি।
ডেমরা: ডেমরায় এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ নেই। স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশা গ্যাস কম পাওয়ায় ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। চালকদের অভিযোগ তারা প্রতিদিনের জমার টাকাও উঠাতে পারছেন না। রেন্ট-এ-কারের চালকরাও একই সমস্যায় পড়েছেন। বন্ধ রাখতে হচ্ছে প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহন। অন্যদিকে গ্যাস বিক্রি কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে ফিলিং স্টেশন মালিকদের।
সারুলিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. সাহিন চৌধুরী বলেন, রানী মহলের ঢালে সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্টেশনে গিয়ে দেখি সিএনজি নেই। ভাড়াও আগের তুলনায় বেশি।
উত্তরা: রোববার সকাল থেকে উত্তরা এলাকার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা যায়, গ্যাস না থাকায় বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন। চালু রাখা হলেও চাপ না থাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস বিক্রি করতে পারছে না। এতে বাধ্য হয়ে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সিএনজি, ট্রাক ও প্রাইভেটকার চালিত যানবাহন চালকরা।
এয়ারপোর্টের মেসার্স মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার বলেন, পরিবহণের বড় অংশই গ্যাস নির্ভর হওয়ায় এবং বিক্রি বন্ধ থাকায় জসীমউদ্দীন পর্যন্ত সিএনজির লাইন চলে গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আরএসআর ফিলিং স্টেশনে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে।
জাহিদ হোসেন নামে এক সিএনজিচালক জানান, প্রতিদিন মহাজনকে জমা দিতে হয় ১২শ টাকা। গ্যাস লাগে প্রায় ৪শ টাকার। এর বাইরে সারা দিনে আমারও দুই-আড়াইশ টাকা খরচ আছে।
সবুজবাগ: ডিআইটি রোডের মালিবাগ হাজীপাড়ায় অবস্থিত সিটি ওভারসীজ সিএনজি লিমিটেড স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর ১২টার পর থেকে ‘গ্যাস নাই’ লেখা সাইনবোর্ড টানিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। সামনে শতাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। একই ভাবে আশপাশের এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে। সংকটের প্রভাব পড়েছে আবাসিক এলাকায়ও। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অনেক বাসাবাড়িতে রান্নাবান্নাই হয়নি।
মালিবাগ হাজীপাড়ার সিটি ওভারসীজ সিএনজি স্টেশনে সিএনজিচালক মো. আমির হামজা বলেন, সকাল ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। সিরিয়াল অনুযায়ী গেটের সামনে আসতেই গ্যাস নেই জানিয়ে বন্ধ করে দেয়। এখন বেলা ৩টা বাজে, এখনো জানি না গ্যাস পাব কিনা।
মিরপুর: অন্যান্য এলাকার মতো মিরপুরে গ্যাসের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিএনজিচালিত পরিবহণ খাত ও বাসাবাড়ির রান্নাবান্না। বেশির ভাগ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ধীরগতিতে গ্যাস সরবরাহ, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধও রাখা হয়েছে।
মিরপুর সিরামিকস সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের স্টাফ নাজমুল বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় মাত্র একটি কমপ্রেশার চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে এবং দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে স্টেশন পরিচালনা করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
যাত্রাবাড়ী: যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। রাত ১২টায় গ্যাসের কিছু সরবরাহ হয়ে ভোর রাতে চলে যায়। এতে করে দিনের রান্না সম্পন্ন করা যায়নি। ফলে খাওয়া-দাওয়ায় চরম কষ্ট হচ্ছে বাসিন্দাদের। অনেকে হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। কেউ বা বারান্দায়, ছাদে, ঘরের ভেতর লাকড়ি দিয়ে মাটির চুলায়, কেউ তিনপাশে ইটা দিয়ে চুলা বানিয়ে রান্না করে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
পুরান ঢাকা: পুরান ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্না করতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসাবাড়ির বাসিন্দারা। শুধু বাসাবাড়িই নয়, সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন চালকরাও। ফলে গৃহিণীরা যেমন রান্না করতে পারছেন না, তেমনি সিএনজি চালকরা গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহেও হিমশিম খাচ্ছেন। যানবাহনের সংকটে দুর্ভোগে পড়েছেন চাকরিজীবীরাও। এর সঙ্গে অতিরিক্ত লোডশেডিং ও তীব্র গরম জনজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
রাজধানীর বংশাল, সূত্রাপুর, ইসলামপুর, গুলিস্তান, মালিবাগ, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোর থেকে শুরু করে দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকে। দীর্ঘ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে ঠিকমতো চুলা জ্বলে না।
গোড়ান এলাকার বাসিন্দা ও সিএনজিচালক মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, গত কয়েকদিন ধরে বাসায় গ্যাসের অনেক সমস্যা হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় রোববার রান্নাই হয়নি। সকালে ভাতের বদলে চিড়া খেয়ে কাজে বের হয়েছি। সারা দিনে দুইশ টাকা আয়ও করতে পারিনি। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাসের আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছি।
সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা আয়েশা আক্তার অনি বলেন, সকালে রান্না করতে গিয়ে দেখি চুলায় গ্যাস নেই। বাচ্চাদের কলা-বিস্কুট খাইয়েই স্কুলে পাঠাতে হয়েছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও গ্যাস না আসায় বাধ্য হয়ে হিটারে রান্না করেছি। প্রতিদিন এভাবে রান্না করলে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যাবে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা। আগে কিছুটা হলেও গ্যাস পাওয়া যেত, এখন সেটিও মিলছে না।
এছাড়া বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ স্টেশন কার্যত বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও স্টেশন খোলা থাকলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় জ্বালানি সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আরিয়ান সাজ্জাদ বলেন, আমরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ নিয়মিত সরবরাহ দিতে না পারায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের কাছেই যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কীভাবে দেব?