গত ৩১ মে রাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন তরুণ ফটোগ্রাফার ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ। অভিযোগ, মদ্যপ অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। ঘটনাটি ঘটে তার নিজের বাড়ির সামনেই। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও ঘটনার ১০ দিনেরও বেশি সময় পর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী। স্নিগ্ধ বলেন, আজও জানি না আমার অপরাধ কী ছিল। কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে কষ্ট হয়।
কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতার সবচেয়ে নির্মম শিকার স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম। গত ১৭ এপ্রিল শহরের শাকপালা এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় সে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখনও শোকে স্তব্ধ তার দিনমজুর মা। সন্তানের বই-খাতা, স্কুল ড্রেস আর ব্যবহৃত জিনিসপত্র আঁকড়ে ধরে তিনি শুধু বিচার চান। তার ভাষায়, আমার ছেলেটাকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু বিচার চাই, যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।"
গত বছরের ২৬ জুলাই শহরের বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ৮১০টি বার্মিজ ও চায়নিজ চাকু উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। এরপরও ধারালো অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; তাদের নিয়ন্ত্রণকারী গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
বগুড়া জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বগুড়ায় ৪৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১০০ জন। এই পরিসংখ্যানকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা কামাল সরকার বলেন, কিশোর গ্যাং এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, এটি একটি সামাজিক সংকট। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল বাছেদ বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে।
বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইনচার্জ ইকবাল বাহার বলেন, শহরের একাধিক কিশোর গ্যাংকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া মুখপাত্র) আতোয়ার রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। পরিবারে সন্তানদের প্রতি নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে সহিংসতার এই চক্র থেকে কিশোরদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায়, ছুরির ঝলকানি আর রক্তাক্ত খবর বগুড়াবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।