এর ফলে শুধু ইলিশই নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রই পড়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। সমুদ্রে মাছ না পেয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো প্রান্তিক জেলে, বিপর্যস্ত হচ্ছে উপকূলীয় অর্থনীতি এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে দেশের সম্ভাবনাময় নীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি)।
সরকারের ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলেন হাজারো জেলে। কিন্তু লাখ লাখ টাকার জ্বালানি, বরফ ও রসদ খরচ করেও অধিকাংশ ট্রলার ফিরেছে প্রায় খালি হাতে। জেলেদের অভিযোগ, তাদের জাল ফেলার আগেই সমুদ্রের মাছ নির্বিচারে তুলে নিচ্ছে শক্তিশালী ট্রলিং সিন্ডিকেট।
উপকূলের জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, অভিযোগও অসংখ্য; তাহলে বছরের পর বছর অবৈধ ট্রলিং বন্ধ হচ্ছে না কেন? তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট প্রশাসনের দুর্বল তদারকি কিংবা কিছু অসাধু ব্যক্তির প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে যাই, কিন্তু মাছ পাই না। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক প্রকাশ্যে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এগুলো বন্ধ করা সম্ভব। তাহলে বন্ধ হচ্ছে না কেন?’
স্থানীয় সূত্র জানায়, সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর এসব বোটের সংখ্যা আরও বেড়েছে। এসব ট্রলিং বোটে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিন। আইন অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও তারা উপকূলের কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যেই নেমে নির্বিচারে মাছ শিকার করছে।
অবৈধ ট্রলিংয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো ‘বটম ট্রলিং’। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে টেনে নেওয়ায় প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জালে প্রতিদিন ধরা পড়ছে কোটি কোটি মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণু ও কাঁকড়ার বাচ্চা।
জেলে আবুল কাশেম বলেন, ‘‘ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ রেণু ধ্বংস হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সাগরে আর মাছই থাকবে না।’’
ক্ষুদ্র নৌকার জেলেরা অভিযোগ করেন, বিশাল ট্রলিং বোটগুলো তাদের জালের ওপর দিয়েই চলাচল করে। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে যায়, অথচ ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা—প্রতিবাদ করলেও জোটে হুমকি-ধমকি। এক বছর আগে শত শত জেলে মানববন্ধন করে অবৈধ ট্রলিং বন্ধের দাবি তুললেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে দাবি তাদের।
মহিপুরের আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে যে পরিমাণ মাছ ঘাটে আসত, এখন তার এক-চতুর্থাংশও আসে না। ফলে ইলিশ, রূপচাঁদা, লইট্টাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি অবৈধ ট্রলিং এখন সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের অন্যতম বড় হুমকি। এভাবে চলতে থাকলে শুধু ইলিশ নয়, বঙ্গোপসাগরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং লাখো মানুষের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, ‘‘ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তারা নিয়মিত তৎপর থাকলেও গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’’
অন্যদিকে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘‘অবৈধ ট্রলিং বোটের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান আছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১০টি মামলা করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভিযান ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। তবে, এই অপরাধটি মোবাইল কোর্টের আইনের আওতায় আনা গেলে দ্রুত বন্ধ করা যেতে পারে।’’
অবৈধ ট্রলিং এখন আর শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামুদ্রিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। উপকূলবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—যদি আইন থাকে, অভিযোগ থাকে, ক্ষতির প্রমাণ প্রতিনিয়ত সামনে আসে, তবে বছরের পর বছর এই অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেট কীভাবে বহাল তবিয়তে চলতে পারে?
উপকূলের হাজারো জেলে এখন আর আশ্বাস নয়, চান দৃশ্যমান অভিযান, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। অন্যথায় রূপালি ইলিশের জন্য খ্যাত বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর একদিন সত্যিই মাছশূন্য হয়ে পড়বে—আর সেই ক্ষতির দায় বহন করতে হবে পুরো দেশকে।