ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির রানওয়েতে পড়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট একটি বিমান। ইরানের হামলার শিকার হওয়ার পর বিমানটির ধ্বংসস্তূপ এখনও সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বাঁকানো ধাতব কাঠামোর মধ্যে উল্টে পড়ে আছে একটি বড় উড়ন্ত থালার মতো অংশ, এটিই আসলে ই-৩ সেন্ট্রি বিমানের ওপর বসানো ঘূর্ণায়মান রাডার ডোম।
এই ই-৩ সেন্ট্রি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই বিমানের মাধ্যমে শত শত মাইল দূর পর্যন্ত আকাশে থাকা সবকিছু নজরদারি করা যায়। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের এই বিমানকে কার্যত একটি ‘উড়ন্ত যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত শুক্রবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের ১৬টি বিমান ছিল, যার প্রায় ৪০ শতাংশ মোতায়েন ছিল মধ্যপ্রাচ্যেই। এখন একটি ধ্বংস হওয়ায় সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে।
ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে হামলা চালায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হন, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। পাশাপাশি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী পাঁচটি ট্যাংকার বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, যেখানে আঘাত লেগেছে অর্থাৎ সেন্ট্রি বিমানের রাডার ডোমের সংযোগস্থলে আঘাতের ধরণ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি অত্যন্ত নিখুঁত ড্রোন হামলা ছিল। এতে তেহরানের গোয়েন্দা সক্ষমতা যে কতটা উচ্চমাত্রার, তার ইঙ্গিত মিলছে। শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, হামলার আগে রাশিয়া সৌদি ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবি তুলেছিল। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া কি ইরানকে সাহায্য করছে? অবশ্যই— ১০০ শতাংশ।’
এটি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের ধারাবাহিক সফল হামলার সর্বশেষ ঘটনা। এর ফলে কিছু মার্কিন সেনাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা
প্রায় চার সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকারকে দুর্বল করা। কিন্তু এই হামলা দেখাচ্ছে, পেন্টাগন হয়তো ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছিল। ই-৩ সেন্ট্রি বিমান ধ্বংস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) জন্য বড় ধাক্কা। ১৯৯২ সালের পর থেকে ব্যবহৃত এই বিমানগুলো আকাশে ২৫০ মাইলের মধ্যে সবকিছু নজরদারি করতে সক্ষম।
এ ধরনের নতুন বিমান তৈরি করতে খরচ হবে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার, তবে বর্তমানে এর উৎপাদন নেই। বিকল্প হিসেবে বোয়িংয়ের ই-৭ ওয়েজটেইল থাকলেও এর দাম প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার। এই ক্ষতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাকি বিমানগুলোকে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। আর তেমনটি হলে আগে থেকেই চাপে থাকা বিমান ও ক্রুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
স্টিম্পসন সেন্টারের গবেষক কেলি গ্রিকো বলেন, ‘এই সক্ষমতা দ্রুত প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। ইরান শুধু একটি বিমান নয়, পুরো যুদ্ধ পরিচালনার একটি স্তরেই আঘাত করেছে।’
যুদ্ধ, কূটনীতি ও অনিশ্চয়তা
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আপাতত ইরানের সরকার পতনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য মূলত সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া এবং যুদ্ধ এমনভাবে শেষ করা যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় হিসেবে তুলে ধরা যায়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও অনেক দূরে।
এদিকে উপসাগরে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন মেরিন ও ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ৩ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে। আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর বিষয়ও বিবেচনা করছে পেন্টাগন। যুক্তরাজ্যসহ ছয়টি দেশ হরমুজ প্রণালি খুলতে সহযোগিতার প্রস্তুতি জানিয়েছে, তবে এই উদ্যোগ সফল হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকার মাধ্যমে ইরান মনে করছে তারা চলমান সংঘাতে এগিয়ে আছে এবং নতুন নেতৃত্ব যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন সেনারা এলে তাদের ‘আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হবে’। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খার্গ দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সীমিত অভিযান শুরু হয়ে কয়েক সপ্তাহের স্থল যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এই পরিস্থিতিকে কেউ কেউ নতুন ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি অচলাবস্থা ভাঙার উপায় হতে পারে।
এদিকে অস্ত্র ব্যবহারের হিসাব বলছে, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যার খরচ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, এই গতিতে চললে পেন্টাগনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
ইরান এখনও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ানোর সক্ষমতা রাখে। বিশ্লেষক অলিভিয়ার গুইত্তা বলেন, ইরান কয়েক হাজার নৌ-মাইন ব্যবহার করে দ্রুত প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘সমস্যা শুধু মাইন পাতা নয়, সেগুলো সরানোর সক্ষমতাও সীমিত।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বড় অংশ এই যুদ্ধের বিপক্ষে। বিভিন্ন জরিপে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ এর বিরোধিতা করেছে। ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মানুষ ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিরোধিতা করছেন, আর মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পক্ষে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে সম্ভাব্য সংলাপের প্রধান আলোচক করা হয়েছে। তিনি অবশ্য ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে আগে থেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
রাশিয়ার ভূমিকা ও বাড়তি ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে, এমনকি উন্নত শাহেদ ড্রোন সরবরাহের সম্ভাবনাও রয়েছে। এদিকে হরমুজ সংকটের কারণে রাশিয়া লাভবান হচ্ছে, কারণ এতে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে তাদের তেল কেনার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহাম ইরানি যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীতে হামলার হুমকিও দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, সংঘাতের এই ধাপ ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।