গত শুক্রবার সকালে খুলনার কয়রার মঠবাড়ি গ্রামের বেড়িবাঁধে দেখা হয় জেলে আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি সেখানে নৌকা মেরামত করছিলেন। আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে আবার ডাকাত দলের তৎপরতা বেড়েছে। ডাকাতদের চাঁদা দিয়ে বনে গিয়ে মাছ না পেলে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে যাবেন।
একই দিন দুপুরে কয়রা থেকে ফেরার পথে সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন খোলপেটুয়া নদীর তীরে নীলডুমুর গ্রামের জেলে রিপন গাজীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধইরে জীবিকা চালাই। নিষেধাজ্ঞার তিন মাস খুব কষ্টে কাটিছে। ধারদেনা কইরে দিন পার করতি হইছে। কিন্তু জলদস্যুদের চাঁদা দিতি হলি সেই আয় দিয়ে সংসার চালানি কঠিন হয়ি পড়বেনে।’
স্থানীয় তিনজন জেলে অভিযোগ করেন, আগেও জলদস্যুদের কাছ থেকে ‘স্লিপ’ (চাঁদা) নিয়ে অনেক বনজীবীকে বনে প্রবেশ করতে হয়েছে। ১৫ দিনের জন্য একটি নৌকা নিয়ে সুন্দরবনে যেতে নৌকাপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা আগাম চাঁদা দিয়ে দস্যুদের কাছ থেকে ওই ‘স্লিপ’ নিতে হতো। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জলদস্যু নির্মূলে নানা উদ্যোগ নেওয়া ও আশ্বাস দেওয়া হলেও বনজীবীদের মধ্যে সেই আতঙ্ক এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
সুন্দরবন খোলার পর অল্প সময়ের মধ্যেই জেলেদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন বলে আশা করছেন কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. শামসুল আরেফীন। জলদস্যুদের চাঁদার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, লোকালয়ে থাকা দস্যুদের সহযোগী, যাঁরা জেলেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে টোকেন দেন, তাঁদের বিষয়েও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের ৪ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ ও ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জলভাগ। সুন্দরবনে আছে ২১০ প্রজাতির মাছ, ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৫৫ প্রজাতির পাখি, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৫০৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী। প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বনজীবী ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকে।
কয়রার শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদীর তীরের পাথরখালী, মঠবাড়ি, কাটকাটা ও মহেশ্বরীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরে নৌকা প্রস্তুতের শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। মহারাজপুর এলাকার জেলে খায়রুল আলম বলেন, তিন মাস নিষেধাজ্ঞার সময় তাঁকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ধার নিয়ে নৌকা ও জাল মেরামতের কাজও শেষ করেছেন।
শ্যামনগর উপজেলার বনজীবী জেলে আবদুল খালেক বলেন, একটি নৌকায় সাধারণত দুই থেকে তিনজন জেলে থাকেন। ছয়-সাত দিনের খাবার ও জ্বালানি সঙ্গে নিয়ে বনে যেতে হয়। দস্যুদের কবলে পড়লে মাছ, জাল, খাবারসহ সবকিছু হারানোর ঝুঁকি থাকে। তিনি আরও বলেন, ‘আর্থিকভাবে সচ্ছল কেউ সাইধে বনে যায় না। যারা যায়, তারা আমাগের মতো গরিব। বাধ্য হয়ি অনিশ্চিত যাত্রায় ছুটতি হয়।’
সুন্দরবনের সম্পদ আহরণের জন্য ১২ হাজার নৌকার বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। এসব নৌযানের মাধ্যমে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা মাছ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন সম্পদ আহরণ করেন। আর সুন্দরবনের সাতটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে প্রতিবছর লক্ষাধিক পর্যটক ভ্রমণ করেন।
জেলেদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার সময়ও সুন্দরবনে অবৈধভাবে মাছ শিকার বন্ধ হয়নি। বন বিভাগের নজর এড়িয়ে কেউ কেউ বিষপ্রয়োগ করে মাছ ধরেছেন। এতে মাছ ও কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধভাবে বনে ঢোকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বন বিভাগ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। বনদস্যুদের তথ্য পেলে কোস্টগার্ডকে জানানো হয়। দস্যু দমনে কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। বন অপরাধ দমনে স্মার্ট টহল দলের পাশাপাশি পায়ে হেঁটেও টহল দেওয়া হচ্ছে। জেলেদের নিরাপত্তা ও অন্যান্য সহায়তায় বন বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।