২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম সফরে একদিনেই টেস্ট হারবে বলে ঠাট্টা করেছিলেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ও কলামিস্ট ডেভিড হুকস। সেবার প্রথম টেস্ট তিনদিনে হারলেও দ্বিতীয় টেস্ট চারদিনে নিয়ে যায় বাংলাদেশ।
কিন্তু ২৩ বছর পর এই সফরে বাংলাদেশ দুই দিনে টেস্ট হারতে পারে বলে রব ওঠে। এবার অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি এমনটা বলেননি। বরং সংবাদ মাধ্যমেই কয়দিনে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট জিততে পারে সেই সম্ভাবনা যাচাই আলোচনায় উঠে আসে দুই দিনে হারের প্রসঙ্গ। প্রথম টেস্টে সেই প্রসঙ্গকে একেবারে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ম্যাচ জিতে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে ওই প্রসঙ্গই সত্যি হয়ে গেল।
ম্যাকাইতে যথারীতি ব্যাটিং ব্যর্থতাতেই হার বাংলাদেশের। এর কেন্দ্রে ছিলেন মিচেল স্টার্ক। দুই ইনিংসে বাংলাদেশের ২০ উইকেটের মধ্যে একাই ১০টি নিয়েছেন বাঁহাতি এই পেসার। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১২ রানে বাংলাদেশের ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দল। শেষ পর্যন্ত ৩৪ ওভারে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। স্টার্ক ১০ ওভারে ৬ মেডেনসহ ১২ রান দিয়ে নেন ৬ উইকেট; প্যাট কামিন্সের শিকার ৩ উইকেট।
বাংলাদেশের ৬৪ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়াও শুরুতে স্বস্তিতে ছিল না। শরিফুল ইসলাম একাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারে তাণ্ডব চালান। তার ৭ উইকেটের অসাধারণ বোলিংয়ে ২১০ রানেই থামে স্বাগতিকদের ইনিংস। অস্ট্রেলিয়া ১৪৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পায়।
এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ মাত্র ৯৫ রানে গুটিয়ে যায়। শুরুতেই আবারও আঘাত হানেন স্টার্ক। সাদমান ইসলাম দ্রুত ফিরে যান, এরপর মুমিনুল হক ও তানজিদ হাসানও টিকতে পারেননি। অধিনায়ক শান্ত কিছুক্ষণ লড়াই করে ২৯ রানে থামেন। তানজিদ তামিম করেন ৯ রান। দুজনের আউটই ছিল আক্ষেপের—ভালো অবস্থানে থেকেও ভুল শট খেলে নিজেদের উইকেট বিলিয়ে দেন।
লিটন দাসের জন্য ম্যাচটি ছিল আরও হতাশার। প্রথম ইনিংসে শূন্য করার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও স্টার্কের বলে শূন্য রানেই ফিরেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া সফরের দুই টেস্টে তার তিন ইনিংসেই এসেছে ডাক—প্রতিবারই স্টার্কের বলে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে দলের অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যাটারের এই ব্যর্থতা বাংলাদেশের বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে। শেষদিকে মুশফিকুর রহিম একাই লড়াই চালিয়ে যান। ৮০ বল মোকাবিলা করে ২৯ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি।
দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটারদের ব্যর্থতার ছবিটাই তাই সবচেয়ে স্পষ্ট। ডারউইনে যে ব্যাটিং ইউনিট অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণকে সামলেছিল, ম্যাকাইতে ট্রু বাউন্স ও গতি পাওয়া উইকেটে সেই একই ব্যাটাররা বারবার ভুল শট খেলেছেন, শরীরের কাছাকাছি বল সামলাতে পারেননি এবং স্টার্ক-কামিন্স-হ্যাজলউডের চাপের সামনে আত্মসমর্পণ করেছেন। প্রথম ইনিংসে ৬৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৫—দুই ইনিংস মিলিয়েও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ২১০ রান পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ।
ডারউইনের নয় উইকেটের ঐতিহাসিক জয়ের পর তাই ম্যাকাইতে এল একেবারে বিপরীত চিত্র। অস্ট্রেলিয়া নিজেদের কন্ডিশনে বাংলাদেশের দুর্বলতাগুলো নির্মমভাবে কাজে লাগাল, বাংলাদেশ পেল কঠিন শিক্ষা—অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি উইকেটে শুধু ভালো বোলিং নয়, ব্যাটিংয়েও মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে টেস্ট ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন।