ইরানের প্রশ্ন জাগতেই পারে এভাবেও কি স্বপ্ন ভাঙে? একবার নয়, দুবার নয়, বারবার!
সমীকরণটা ছিল সহজ। শেষ ম্যাচে মিসরকে হারাতে পারলেই নিশ্চিত হতো শেষ ৩২। ইতিহাসও লেখা হয়ে যেত, কারণ এর আগে কখনোই বিশ্বকাপের নকআউটে খেলেনি পশ্চিম এশিয়ার দেশটি।
যোগ করা সময়ে খালিলজাদেহর পা থেকে জালে বল জড়াতেই সেই ইতিহাস যেন হাতছানি দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ভিএআরের হস্তক্ষেপ আর ফুটবলের এক বিরল প্রয়োগ হওয়া অফসাইড আইন কেড়ে নেয় উদযাপনের মুহূর্ত।
অনেকের ধারণা, একজন ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেললেই অফসাইডের ঝুঁকি থাকে না। বাস্তবে নিয়মটি ভিন্ন। খালিলজাদেহ বল পাওয়ার সময় সামনে ছিলেন একজন ডিফেন্ডার, গোলরক্ষক আরও পেছনে, আর তারও সামান্য পেছনে ছিলেন ফরোয়ার্ড হামজা আবদেলকারিম। চোখে দেখে অফসাইড মনে না হলেও আইনের ব্যাখ্যায় সেটিই অফসাইড। ফলে বাতিল হয়ে যায় গোলটি। সিয়াটল থেকে তেহরান উল্লাসের ঢেউ মুহূর্তেই থেমে যায়।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষার পালা। ক্রোয়েশিয়ার হার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তারা জিতল। এরপর উজবেকিস্তান ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে এগিয়ে যেতেই নতুন আশার আলো দেখেছিল ইরান। কিন্তু কঙ্গো ঘুরে দাঁড়িয়ে তিন গোল করে নিশ্চিত করে শেষ ৩২।
শেষ ভরসা ছিল অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচ। সেই ম্যাচেও নাটক কম হয়নি। মার্কো আর্নাতোভিচের গোলে এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়া, রাফিক বেলঘালি সমতা ফেরান। পরে মার্সেল সাবিতজারের গোলে আবার এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়ানরা। ইরানের আশা তখনও বেঁচে ছিল। কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রিয়াদ মাহরেজ সমতা ফেরান।
যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে মাহরেজ আবারও গোল করে আলজেরিয়াকে এগিয়ে দিলে মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি ভাগ্য অবশেষে ইরানের দিকে হাসল। মাত্র পাঁচ মিনিট অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচে ৯৪ মিনিটের গোলের পর আর কী-ই বা হওয়ার ছিল!
কিন্তু ভাগ্য যেন তখনও শেষ আঘাতটা বাকি রেখেছিল। ৯৬ মিনিটে সাশা কালাইজিচ গোল করে অস্ট্রিয়াকে সমতায় ফেরান। ফলাফল দুই দলই শেষ ৩২-এ, আর ইরানের স্বপ্ন আবারও অধরাই থেকে গেল।
তবু এই বিশ্বকাপ ইরানের জন্য ব্যর্থতার গল্প নয়। তিন ম্যাচে নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিশরের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে অপরাজিত থেকেছে তারা। কাগজে-কলমে তিনটি ড্র হলেও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই ফলাফল অনেকটাই জয়ের সমান।
কারণ মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও ইরানকে লড়তে হয়েছে আরও বড় প্রতিকূলতার সঙ্গে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছিল দলটির বিশ্বকাপ যাত্রায়। অনেক কর্মকর্তা ভিসাই পাননি। খেলোয়াড়দের ভিসা মিললেও পুরো দলকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে মেক্সিকো থেকে উড়ে গিয়ে, ম্যাচ শেষ করেই আবার ফিরে।
ম্যাচের আগের দিনের অফিসিয়াল ট্রেনিংয়ের সুযোগও তারা পায়নি। কারণ সেদিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতিই ছিল না। ম্যাচ শেষে প্রয়োজনীয় রিকভারিও করতে হয়েছে দীর্ঘ বিমানযাত্রার ধকল সামলে।
একদিকে প্রতিপক্ষের মাঠ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা, তার ওপর শারীরিক ক্লান্তি সব মিলিয়ে ইরানের সামনে ছিল একের পর এক বাধা। তবুও তারা লড়েছে, মাথা নত করেনি। নকআউটের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
তাই এই যাত্রাকে ব্যর্থ বলা যায় না। হয়তো নকআউটে ওঠা হয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে ইরান ফিরছে অপরাজিত থেকে। সবচেয়ে বড় কথা, ফিরছে মাথা উঁচু করে।