বুক ভরা স্বপ্ন বুনে জমিতে সোনালী ধান রোপণ করেছিলেন গ্রাম বাংলার কৃষক। ঘাম ঝরানো শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে আগামী দিনগুলো এমনটাই আশা তাদের। চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধু সোনালী প্রান্তরের মায়াবী হাতছানি। বোশেখী খরতাপে লু-বাতাসের সঙ্গে সোনালী ধানের শীষে মাঠে মাঠে দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। ধানের শীষ আর সেই দোলায় লুকিয়ে আছে হাজারো কৃষকের রঙিন ভালবাসা। তপ্ত দুপুরে দিগন্ত জুড়ানো ফসলের মাঠ, সেই সতেজ ঘ্রাণ আর ঢেউ খেলানো দৃশ্য জানান দিচ্ছে, আর মাত্র কদিন পরই কৃষকের উঠান ভরে উঠবে মুঠো মুঠো উৎসবে।আছড়ে পড়বে সোনালী ধান। ভরে উঠবে কৃষকের গোলা। মুখে ফুঁটবে সোনালী হাসি।
সরেজমিনে ধানের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, জেলার সব এলাকার মাঠ গুলোতে একই চিত্র। আলমডাঙ্গা উপজেলা জুড়ে ফসলের মাঠ, সবুজ বর্ণ থেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ধান কেটে ঘরে তোলা শুরু হবে । বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মাঠেই ধানের শীষে পাক ধরেছে। আবার কোন কোন মাঠে সবুজ শীষও এখনও বিদ্যমান।
দামুড়হুদা উপজেলায় রোপা আমন ধানের পর রবি ফসলের চাষ হয় প্রচুর। এজন্য বোরো ধান রোপণ করে থাকে এলাকার কৃষকরা। কিন্তু এবার বৃষ্টির অপেক্ষায় কিছুটা দেরিতে রোপণ করা হয়। বেশির ভাগ কৃষক সেচের পানিতেই রোপন করে ফেলেন। যার কারণে বাড়তি খরচও গুণতে হয়েছে তাদের। যদিও মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় স্বস্তি মিলেছে তাদের। এর পরেও এবার ধান চাষাবাদে কৃষকদের দ্বিগুণের বেশি খরচ গুণতে হচ্ছে। সেচের পানিতে রোপণসহ, বাড়তি দামে কিনে সার কীটনাশক ব্যবহার কৃষকদের মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো হয়ে আছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক জানান, এবার বোরো ধান রোপন করা থেকে শুরু করে পরিচর্যায় খরচ বেশি হয়েছে। আর কিছুদিন পর পাকা ধান ঘরে উঠবে সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা। আবাদ ভাল হলেও সেচ নিয়ে কৃষকদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। এখন লোডশেডিং চলছে কিছুদিন আগেও কৃষকরা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎসেবা পেয়েছেন কিন্তু এখন প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ ঘন্টা লোডশেডিং চলছে। আবার যেখানে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর সেচকাজ নির্ভর, সেখানে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছে না। কৃষকদের দাবি, ধান উৎপাদনে সেচ, শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। ঝাঁঝালো রোদের মাঝে মাঠে মাঠে সবুজ আর সোনালী ধানের আগমনী বার্তা যেন কৃষকদের মনে নির্মল আনন্দের আবহ বয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এই বছরে ধানের বাম্পার ফলন হবে এবং বেশি দামে ধান বিক্রি করবে বলে আশা করছেন কৃষকেরা।
কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ধান আবাদে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। ফলনও বাম্পার হয়েছে। আমার জমিতে ধান কাটা শুরু করেছি। আশা করছি ঝড়-বৃষ্টি না হলে আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে সব ধান ঘরে তুলতে পারব। শুনেছি বাজারে দাম ভালো। আশা করছি এবার লাভ হবে।’
কুড়ুলগাছি গ্রামের কৃষক ইয়াকুব বলেন, ‘আমার ছয় বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। শুরুর দিকে পানি না পেলেও পরে যথেষ্ট পানি পেয়েছি। প্রায় জমির ধান পেকে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটা-মাড়াই শুরু করব।’
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, এ উপজেলায় চলতি বছরে ৮ হাজার ৭৫৭হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮হাজার ৭৫৭ হেক্টর। এখনো পর্যন্ত কৃষকদের ধান ভালো পর্যায়ে আছে। অফিস থেকে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা সঠিক সময় ধান কেটে ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছি। সারা বছরের সব কষ্ট ভুলে যায় এই সোনারঙা ধানের শীষ দেখলে।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, এ উপজেলায় ৭ হাজার ২৬২হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর। এবছর বোরো ধান চাষ বেশী হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কৃষকদের ধান ভালো পর্যায়ে আছে, আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে কৃষকেরা কাঙ্খিত ফলন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কাজেই কৃষক সঠিক সময় ধান কেটে ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছি।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ‘বোরো ধানের সেচ নিয়ে আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত কোনো কৃষক অভিযোগ করেননি। এখন লোডশেডিং হলেও কয়েকদিন আগেও কৃষকরা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎসেবা পেয়েছেন। আবার যেখানে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর সেচ নির্ভর, সেখানে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পেয়েছেন। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের সমন্বয়ে কৃষক সুবিধা মতো বোরো ধানে সেচ দিতে পেরেছেন। এবার বোরো মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। ফলনও খুব ভাল হয়েছে। ভুট্টা কর্তন করার ফলে সেই জমিতে কৃষকরা পাট চাষ করেছে। পাট কেটে সেই জমিতে ধান চাষ করেছেন তারা। কৃষকদের নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি বলে জানান কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা।