গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হোরমোজগান প্রদেশের মিনাবের শাজারায়েহ তায়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। জাতিসংঘের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্য অনুসন্ধান মিশনের দীর্ঘ তদন্তে বলা হয়েছে, হামলার সময় স্কুলটির বেসামরিক পরিচয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল।
তদন্তকারীদের মতে, স্কুলটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের একটি নৌ স্থাপনার কাছাকাছি হলেও দেয়াল ও পৃথক প্রবেশপথ দিয়ে আলাদা ছিল। স্যাটেলাইট ছবিতেও শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ ও শিশুদের আঁকা ম্যুরাল দেখা যায়।
জাতিসংঘের মিশন বলছে, স্কুলটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না তা যাচাই করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য সব ধরনের সতর্কতা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা পূরণ করেনি। তাদের অনুসন্ধানে হামলায় ‘বেপরোয়া’ আচরণের যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলাটি হয় দুই দফায়। প্রথম আঘাতের পর কর্মীরা শিশুদের ওপরের তলার একটি প্রার্থনা কক্ষে সরিয়ে নেন। পরে দ্বিতীয় হামলা সেখানে আঘাত হানে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, মিনাবের ওই হামলায় ১৫৬ জন নিহত হন। জাতিসংঘের মিশন যে স্বাধীন সূত্রের তথ্য পেয়েছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা ১৫৭ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও ছিল।
হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়েও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বলে শনাক্ত করেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্কুলটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তদন্তে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে স্কুলটিকে পাশের সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে শনাক্ত করার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
লারমেদে একই দিনের আরেক হামলা নিয়েও ভিন্ন দাবি রয়েছে। জাতিসংঘের মিশন বলছে, শহীদ হাজ খলিল নাইমি কালচারাল অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সের কোনো সামরিক ব্যবহার ছিল না। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে সেখানে চার শিশুসহ ২২ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন।
এই হামলার দায় অবশ্য অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে ইরানের হোয়েইজেহ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মিল রয়েছে। তবে জাতিসংঘের মিশনের অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হননি।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ফলাফলও প্রত্যাখ্যান করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বরং ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা এবং হামলার আগে সম্ভাব্য সতর্কতা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে জাতিসংঘের এই তদন্ত প্রতিবেদন কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। প্রতিবেদনে উঠে আসা অনুসন্ধান ভবিষ্যতের আইনি বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মিনাবের স্কুলে হামলা ভুলবশত হয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্যের বিপরীতে জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে যথাযথ যাচাই ও সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই গুরুতর প্রশ্ন।