২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। দুই বছর পর এসে মাঠের পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার জন্য ‘সম্পূর্ণ বৈরী ও অত্যন্ত প্রতিকূল’।
বিগত দুই বছরে দলের সিংহভাগ নেতাকর্মীই হয় আত্মগোপনে, না হয় কারাগারে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশের ভেতর রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো আইনত অসম্ভব। বিভিন্ন সময়ে ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা হলেও সেখান থেকে দ্রুত আটকের ঘটনা ঘটেছে। এই দৃশ্যপটে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার দেশের ফেরার দাবিকে বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ বা দলের ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙা করার একটি কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বীর আহমেদের পর্যবেক্ষণ একটু ভিন্ন। তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার ফেরা আর আওয়ামী লীগের ফেরা দুটা আলাদা জিনিস।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় দলটিকে মাঠে ফিরতে হলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই আসতে হবে। কিন্তু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আইনি বাধা নেই, কারণ খোদ রাষ্ট্রই তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে ফেরত চাইছে। অধ্যাপক আহমেদ মনে করেন, গণমাধ্যমে সরাসরি ফেরার বার্তা দেয়ার পেছনে একটি ‘অন্তর্নিহিত তাৎপর্য’ রয়েছে। তিনি হয়তো দেশে ফেরার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ওপর একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত; আওয়ামী লীগপন্থী এবং আওয়ামী লীগবিরোধী। দেশের একটি বড় অংশ এখনো দলটির ঘোর বিরোধী।
ড. সাব্বীর আহমেদের মতে, দেশের ভেতর যদি আওয়ামী লীগের ৩০ শতাংশ অনুগত সমর্থকও থাকে, বাকি ৭০ শতাংশ তাদের বিরুদ্ধে। অস্তিত্ব সংকটে থাকা এই ৩০ শতাংশের পক্ষে এই মুহূর্তে একত্রিত হয়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বাস্তবতা নেই। ফলে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথেই হাঁটতে হবে, যদিও বর্তমান ধারা তার উল্টো।
অবশ্য মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বিষয়টিকে দেখছেন একটি ‘ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রাম’ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘সবকিছু অনুকূল হয়ে যাওয়ার পর আন্দোলন হয় না। তিনি যদি ডিসেম্বরে আসতে নাও পারেন, তবে আরেকটি তারিখ দেবেন; এটিও রাজনৈতিক আন্দোলনেরই অংশ।’
আইনি দিক থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৬৬৩টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই হত্যার। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাফ জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি স্বাধীনভাবে এসে আত্মসমর্পণ করবেন, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। তবে আইনজ্ঞদের মতে, দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ সাপেক্ষে এই সাজার বিরুদ্ধে আপিল করার আইনি সুযোগ এখনো তার রয়েছে।
বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর মতে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে অতি দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে এবং শেখ হাসিনা এই আদালতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আন্তর্জাতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার একটি সুযোগ নিতে পারেন।
শেখ হাসিনার এই বার্তা আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সংসদের রাজনৈতিক নেতারা। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এটিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, তবে কেবল ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্যই ফিরবেন।’ অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আসাদুজ্জামান রিপন সরাসরি মন্তব্য করেছেন, শেখ হাসিনা ‘আসছেন না, আসতে পারবেন না’।