সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন এমনই ব্যস্ততা। পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে পাটের দামও মোটামুটি ভালো থাকায় কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি।
পাট কাটার পর ১৫ থেকে ২০ দিন পানিতে জাগ দিয়ে রাখার পর আঁশ ছাড়ানোর উপযোগী হয়। বর্তমানে জেলার বেশির ভাগ এলাকায় চলছে পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ। কোথাও কোমরসমান পানিতে নেমে কৃষকরা পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন। আবার কোথাও ভ্যানগাড়িতে পাটের বোঝা নিয়ে বাজারের দিকে যেতে দেখা যাচ্ছে তাদের।
সাতক্ষীরা আশাশুনি সড়কর পাশে ধুলিহর এলাকায় বৃহস্পতিবার দুপুরে পাটের আঁটি বাঁধছিলেন কৃষক মাজেদ আলী। তিনি বলেন, ১৯ দিন পানিতে জাগ দিয়ে রাখার পর তিন-চার দিন আগে পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়েছেন। এখন আঁটি বেঁধে শুকাচ্ছেন। ধান কাটার পর জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় মোট ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর ১১ হাজার ৬০৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ৬৮ হেক্টর।
চলতি মৌসুমে এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বেলে প্রায় ১৮২ কেজি পাট থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। এখনো কয়েকটি এলাকায় পাট কাটা চলছে। কৃষকরা প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ মণ ফলনের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পাটের পাতা মাটির উর্বরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি পাটের আঁশ ও পাটকাঠি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে জেলায় পাটভিত্তিক কোনো শিল্প না থাকায় উৎপাদিত পাট স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরেও বিক্রি হয়।
সোমবার সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাধবকাঠি এলাকায় সড়কের ওপর পাটের আঁশ শুকাতে দেখা যায় এক নারীকে। প্রায় ২০ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে এখন রোদে শুকাচ্ছেন তিনি।
একই সড়কের পাশে বিলের পানিতে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন তিন কৃষক। তাদের একজন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ১১ শতক জমিতে পাট চাষ করতে বাজার থেকে ৩০০ গ্রাম বীজ কিনে বুনেছিলেন। প্রায় দুই মণ পাট হয়েছে। পাশাপাশি পাটকাঠিও পেয়েছেন। প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন।
সদর, তালা, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটখেতে রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম ছিল। সাধারণত পাটে ছত্রাকজনিত গোড়া পচা, পাতা শুকিয়ে যাওয়া ও বিছা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এবার এসব রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
কলারোয়া উপজেলার ঝাপাঘাট গ্রামের সড়কের পাশে একটি ডোবার পাড়ে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন কৃষক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, পাঁচ কাঠা জমিতে পাট চাষ করেছি। ৩৪ আঁটি পাটকাঠি হয়েছে। আর পাট হবে আড়াই থেকে তিন মণ। সব মিলিয়ে চাষ ও পাট ধোয়া বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে এবার লাভ থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, গত বছর পাটে রোগবালাই বেশি ছিল। বারবার পাটখেতে কীটনাশক দিতে হয়েছে। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় রোগবালাই কম হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে পাটের দামও ভালো।
কলারোয়ার হেলাতলা এলাকার কৃষক করিম হোসেন বলেন, আমি প্রতিবছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করি। গত বছর ২৫ মণ পাট পেয়েছিলাম। এবার ফলন ভালো হয়েছে। প্রায় ৩০ মণ পাট হবে বলে আশা করছি।
পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর তা রোদে শুকানোর পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাটকাঠি সংরক্ষণ করছেন কৃষকরা। কোথাও বাড়ির আঙিনায়, কোথাও সড়কের পাশে বড় বড় আঁটি করে রাখা হয়েছে পাটকাঠি।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দামে মোটামুটি সন্তুষ্ট কৃষকরা। গত বছরও পাটের দাম কাছাকাছি ছিল। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং মৌসুমের শেষ দিকে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ্ মোহামাদ আবদুল্লাহ বলেন, সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা এলাকায় পাটের বড় বাজার রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছেন। এখন কৃষকরা বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারদর জানতে পারেন।
সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে পাটের ভালো ফলন, তুলনামূলক কম রোগবালাই এবং সন্তোষজনক বাজারদর সাতক্ষীরার কৃষকদের স্বস্তি দিয়েছে। মাঠ থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো পর্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেই এখন সোনালি ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় তারা।