বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খেলাধুলার সময় হঠাৎ মোচড় খাওয়া, দ্রুত দিক পরিবর্তন করা কিংবা সংঘর্ষের ফলে হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যেতে পারে। এছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, পা পিছলে পড়ে যাওয়া বা হাঁটু মোচকে যাওয়ার মতো ঘটনাও লিগামেন্ট ইনজুরির অন্যতম কারণ। অনেকেই প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ আঘাত মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এ ধরনের আঘাতের ফলে হাঁটুর ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পরবর্তীতে জটিলতার সৃষ্টি করে।
লিগামেন্ট ইনজুরির পর সাধারণত হাঁটু ফুলে যায়, তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং হাঁটু ভাঁজ বা সোজা করতে অসুবিধা হয়। হাঁটার সময় হাঁটু অস্থির মনে হতে পারে। অনেক রোগী জানান, হাঁটুর ওপর ভর দিলে এটি হঠাৎ ঘুরে যায় বা ছুটে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরি নির্ণয়ে রোগীর উপসর্গ মূল্যায়ন ও শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি এক্স-রে এবং এমআরআই করা হয়। বিশেষ করে এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে লিগামেন্ট, মেনিস্কাস এবং হাঁটুর অন্যান্য নরম টিস্যুর ক্ষতি বিস্তারিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়। ফলে রোগের সঠিক মূল্যায়ন এবং কার্যকর চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বিশ্রাম, বরফ প্রয়োগ, ব্যথানাশক ওষুধ এবং হাঁটুর ব্রেস ব্যবহারের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে গুরুতর লিগামেন্ট ইনজুরির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এসব চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে হাঁটু বারবার ছুটে যাওয়া বা স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরে না এলে আধুনিক আর্থ্রোস্কপিক (Arthroscopic) সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে। এ পদ্ধতিতে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত লিগামেন্ট পুনর্গঠন করা হয়। ফলে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব হয় এবং রোগী তুলনামূলক দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
লিগামেন্ট ইনজুরির চিকিৎসায় বিলম্ব হলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন হাঁটুর অস্থিতিশীলতা থাকলে মেনিস্কাস এবং অন্যান্য লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে অল্প বয়সেই হাঁটুর ক্ষয়জনিত রোগ বা অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis) হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। তাই সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরি প্রতিরোধেও কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি। খেলাধুলার আগে পর্যাপ্ত ওয়ার্ম-আপ করা, নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে উরু ও পায়ের পেশি শক্তিশালী রাখা, সঠিক কৌশলে খেলাধুলা করা এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করলে ইনজুরির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকার অর্থোপেডিক্স ও স্পোর্টস ইনজুরি বিভাগে হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরির জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সুবিধা। অত্যাধুনিক এমআরআই প্রযুক্তি, উন্নত আর্থ্রোস্কপি সিস্টেম এবং অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক সার্জনদের সমন্বয়ে এখানে রোগীদের জন্য সর্বাধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের পর সমন্বিত পুনর্বাসন ও ফিজিওথেরাপি সেবার মাধ্যমে রোগীদের দ্রুত স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করা হয়।
হাঁটুর ব্যথা, ফোলা কিংবা অস্বাভাবিক অস্থিতিশীলতাকে কখনোই অবহেলা করবেন না। সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণই পারে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা থেকে রক্ষা করতে এবং সুস্থ, স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
লেখক
মেজর জেনারেল প্রফেসর ডা. মো. আনিসুর রহমান হাওলাদার
সিনিয়র কনসালটেন্ট
অর্থোপেডিক্স বিভাগ
এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা