* যুদ্ধ ও ভিসা-জটিলতায় মধ্যপ্রাচ্যে চরম অনিশ্চয়তা: রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন শঙ্কা, বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজছে বাংলাদেশ
- * অতিনির্ভরশীলতার খেসারত! সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার, ইউরোপ-এশিয়ায় নতুন গন্তব্য খুঁজছে সরকার
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান ভরসাস্থল মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ কঠোর নীতি ও ভিসা-জটিলতায় এই অঞ্চলে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে। এর সরাসরি ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার ৩৩ শতাংশ কমেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা আগামী দিনে দেশের অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলবে। তাই এখনই দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে ইউরোপ বা এশিয়ার দেশগুলোতে নজর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
কর্মী রপ্তানিতে ব্যাপক ধস
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন কর্মী পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কর্মী কম গেছেন।
বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবেও কর্মী যাওয়ার হার ভয়াবহভাবে কমেছে। গত বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন কর্মী গেলেও, চলতি বছর তা কমে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রধান এই বাজারটিতে কর্মী গমন কমেছে ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ।
আমিরাতে ভিসা বাতিল ও সৌদি আরবে যুদ্ধ-আতঙ্ক
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আরব আমিরাতের রাস্তায় বিক্ষোভের দায়ে ৫৭ বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ধ রেখেছে ইউএই সরকার। এর মধ্যে নতুন শঙ্কা যোগ হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আমিরাতে কর্মরত অন্তত ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ায় তারা অবৈধ হয়ে পড়েছেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সময় কিছু প্রবাসী অতি উৎসাহী হয়ে যুদ্ধের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করায় ইউএই সরকার এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে ভিসা বাতিল করছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার কারণে সৌদি আরবের শ্রমবাজারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ছুটিতে দেশে এসে অন্তত ২০ হাজার প্রবাসী আটকা পড়েছেন। রিয়াদে কর্মরত এক বাংলাদেশি কর্মী তারিকুল ইসলাম জানান, "বোমা হামলার কারণে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখন কাজের চেয়ে জীবন রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
রেমিট্যান্স প্রবাহে শঙ্কার মেঘ
শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব দেশের রেমিট্যান্সেও পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। যদিও সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার পর থেকেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ হঠাৎ কমে যায়।
বিকল্প বাজার অনুসন্ধানে সরকারের উদ্যোগ
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও জাপানের শ্রমবাজার খোলার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ও শাকিরুল ইসলাম মনে করেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি দক্ষতা ও ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে নতুন বাজার ধরতে হবে।
সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণেই মূলত জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এখন ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে নতুন বাজার খুঁজছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন কিছু খাতে জনশক্তি রপ্তানির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।