বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

এক্সক্লুসিভ

গেণ্ডারিয়ার যে ঘুণ্টিঘর বিতর্কে মন্ত্রিত্ব গেল ইশরাকের, কী চলছে এখন?

গেণ্ডারিয়ার যে ঘুণ্টিঘর বিতর্কে মন্ত্রিত্ব গেল ইশরাকের, কী চলছে এখন?

পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকা এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে একটি রাজনৈতিক পদত্যাগের পর সেখানে চলা সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী উত্তাপের মধ্যেই ঘুণ্টিঘর এলাকায় দেখা গেছে এক ভিন্ন রূপ। দিনের আলোয় রেললাইনের দুই পাশ জুড়ে সেখানে চলছে প্রকাশ্যে মাদকের হাট।

গাঁজা, হেরোইন আর ইয়াবা বিক্রির পাশাপাশি মাত্র ২০ টাকার বিনিময়ে মাদক সেবনের ‘নিরাপদ’ ঘর বা ‘গাপ্পা’ তৈরির অভিনব বন্দোবস্ত করেছে কারবারিরা। স্থানীয় অনেকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সদ্য পদত্যাগ করা মুক্তিযুদ্ধ বিষয় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অভিযানে জনমনে স্বস্তি এনেছিল।

কিন্তু প্রকাশ্যে তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযানে আসায় তা সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করেন। নেটিজেন ও স্থানীয় অনেকের মতে, ঘুণ্টিঘর ইস্যুতে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগে মাদত কারবারিদের হাত শক্তিশালী হয়েছে। চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

২০ টাকায় সেবনের ঘর ও অস্ত্রধারী পাহারা
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দয়াগঞ্জ রেলগেট থেকে ঘুণ্টিঘর এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক ভয়ঙ্কর চিত্র। রেললাইনের পশ্চিম পাশের ফাঁকা জায়গায় ৫০ থেকে ৬০ জনের জটলা। কারও হাতে গাঁজার পুরিয়া, কেউবা ব্যস্ত হেরোইন ও ইয়াবার দর-কষাকষিতে। ফাঁকা জায়গার দেয়াল ঘেঁষে অস্থায়ী কাগজের ছাউনিতে বসে দেদারছে মাদক সেবন করছেন আসক্তি প্রার্থীরা।

স্থানীয় এক পরিবহন শ্রমিকের তথ্য মতে, ২৫০ টাকায় একটি ইয়াবা কিনে নির্দিষ্ট ওই ‘গাপ্পা’ ঘরে বসে খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ২০ টাকা দিতে হয়। মাদক কিনে নিরাপদে রেলগেট পর্যন্ত পৌঁছানো যায়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো বাধা থাকে না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক কারবারিদের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী লাঠি, চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়। বিগত দিনে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিতে গেলে তাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত ডিসেম্বরেও কারবারিদের পাথরের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছিলেন।

কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই সাম্রাজ্য?
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, ৩৬৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারির মধ্যে ঘুণ্টিঘর এলাকার নামাপাড়া রেললাইন বস্তি নিয়ন্ত্রণ করেন রহিমা নামের এক নারী, যার স্বামী হযরত স্থানীয় ‘বেলবাট্টি গ্রুপের’ প্রধান। পাশের ডিস্টিলারি রোডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মনিরুল হক রবিন ও মিনুর হাতে।

এছাড়া রানা ওরফে পিচ্চি রানা, সবিজুল ইসলাম সজিব, গোলাম মোস্তফা বিকাশ এবং মিলন ওরফে ল্যাংড়া মিলনের নামও উঠে এসেছে বিভিন্ন এলাকার কারবার নিয়ন্ত্রক হিসেবে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মূলহোতারা পর্দার আড়ালে থাকলেও তাদের পেটোয়া বাহিনী ও খুচরা বিক্রেতারা পুরো এলাকাকে জিম্মি করে রেখেছে।

অভিযান এবং চক্রের স্থায়ী রূপ
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা দক্ষিণ বিভাগ ও এসআরবি-৩ এর যৌথ উদ্যোগে ঘুণ্টিঘর এলাকায় পরিচালিত হয় সাঁড়াশি অভিযান। ছদ্মবেশে পরিচালিত এই অভিযানে দুই নারীসহ ১৫ জনকে আটক করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

তবে স্থানীয়দের আক্ষেপ, অভিযানে যাঁদের আটক করা হয় তাঁরা মূলত দিনমজর বা খুচরা বিক্রেতা। মূল অপরাধী ও গডফাদাররা বরাবরই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ডিএনসির ঢাকা দক্ষিণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন স্বীকার করেছেন যে এসব ভাসমান কারবারিরা অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার ফিরে আসে।

এর সত্যতাও মিলল হাতেনাতে। সোমবার (১৯ অক্টোবর)) বিকেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও সাজা ঘোষণা শেষে যৌথ বাহিনী এলাকা ছাড়ার মাত্র কিছুক্ষণ বাদেই ফের পুরোনো রূপে ফিরে আসে ঘুণ্টিঘর। রেললাইনের ধারে বসে মাদকসেবীরা আবারও গাঁজা টানতে শুরু করে, যা স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

নতুন মাত্রা ও নাগরিক উদ্বেগ
মাদক কারবারের এই অবাধ বিস্তার কেবল গেণ্ডারিয়ার সামাজিক পরিবেশকেই নষ্ট করছে না, বরং উঠতি বয়সী তরুণ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। স্থানীয় নারী ও অভিভাবকদের দাবি, সাময়িক ঝটিকা অভিযান দিয়ে এই অপরাধ দমন অসম্ভব। ঘুণ্টিঘর ও এর আশপাশের এলাকাকে স্থায়ীভাবে মাদকমুক্ত করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:

১. স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন: রেললাইনসংলগ্ন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা বা স্থায়ী ক্যাম্প বসানো।
২. গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা: কেবল খুচরা বিক্রেতা নয়, তালিকাভুক্ত মূল কারবারি ও গডফাদারদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৩. সামাজিক সচেতনতা ও পুনর্বাসন: মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসার পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজকে খেলাধুলা ও গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করা।

গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর আজ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক বিতর্ক ছাপিয়ে এই জনপদের সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে প্রয়োজন কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। খবর: নবোদয়

আরও

৬০৮ কোটি টাকার ড্রোন প্রকল্প: জনগণ কী জানে, কী জানে না

এক্সক্লুসিভ

৬০৮ কোটি টাকার ড্রোন প্রকল্প: জনগণ কী জানে, কী জানে না

দেশে সামরিক ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপনে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের (সিইটিসি)...

২০২৬-১০-১৪ ২০:০৬

এক প্ল্যাটফর্মে মিলবে ব্যবসার সব অনুমোদন, কীভাবে

এক্সক্লুসিভ

এক প্ল্যাটফর্মে মিলবে ব্যবসার সব অনুমোদন, কীভাবে

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করতে ব্যবসা অনুমোদন...

২০২৬-১০-১৪ ১৯:৪১

ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি: ভূরাজনৈতিক লাভ নাকি সার্বভৌমত্বে ঝুঁকি?

এক্সক্লুসিভ

ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি: ভূরাজনৈতিক লাভ নাকি সার্বভৌমত্বে ঝুঁকি?

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক টার্মিনাল, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্ত...

২০২৬-১০-১৩ ১৭:৫৩

তাজমিন হত্যা: সুমনকে নিয়ে নতুন তথ্য পুলিশের

এক্সক্লুসিভ

তাজমিন হত্যা: সুমনকে নিয়ে নতুন তথ্য পুলিশের

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া আদালতে হত্যার...

২০২৬-১০-১২ ১৩:৪২

রাজপথের সংকট রূপ নিচ্ছে প্রাদেশিক ক্ষমতার লড়াইয়ে

এক্সক্লুসিভ

রাজপথের সংকট রূপ নিচ্ছে প্রাদেশিক ক্ষমতার লড়াইয়ে

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পাকিস্তানে কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতার সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইসলামাবাদমুখী পদযা...

২০২৬-১০-১১ ১৩:১৪

লিকেজে বাড়ছে দুর্ঘটনা, সিলিন্ডারের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

এক্সক্লুসিভ

লিকেজে বাড়ছে দুর্ঘটনা, সিলিন্ডারের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

নারায়ণগঞ্জে এক রাতে তিন স্থানে বিস্ফোরণে নয়জন দগ্ধ হওয়ার ঘটনা গ্যাস ব্যবহারের নিরাপত্তাকে আবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তবে...

২০২৬-১০-১০ ১২:১৫